বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিশেষ উদ্যোগ ‘বিগ-বি’কে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। এ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলা, জ্বালানি নিরাপত্তা, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াবে ঢাকা ও টোকিও। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে জাপান থেকে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগ এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
আজ শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফরের বিস্তারিত তুলে ধরতে গিয়ে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক উল্লেখ করে স্বাগত জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি। নবগঠিত সরকারকেও অভিনন্দন জানান তিনি।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও সংঘাতমুখী ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও আইসিটি অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়নে কাজ করবে দুই দেশ। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলা, সংযোগ বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সক্ষমতা জোরদার, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও অঙ্গীকার করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেয়া, এমআরটি লাইনের কাজ ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় জাপানের ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে জাপানের ৫ হাজার কোটি ইয়েন বা প্রায় ৩১৪ মিলিয়ন ডলারের ‘ইমার্জেন্সি সাপোর্ট লোন ফর এনহ্যান্সিং ইকোনমিক রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড স্টেবল এনার্জি সাপ্লাই’-এর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, রেমিট্যান্স ও লাইসেন্সিং-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণ এবং স্বচ্ছতা বাড়িয়ে বিনিয়োগ সহজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সফর উপলক্ষে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন, ইএসডিপি, উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতাসহ মোট ছয়টি সহযোগিতা ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিনিয়োগ পরিবেশ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্লেজিংও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জাপান থেকে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, এ উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী জাপানের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটি, জাইকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং দেশটির বিভিন্ন বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর আমাকাওয়া কাজুহিকোর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশে জেবিআইসির একটি কার্যালয় খোলার অনুরোধও জানান প্রধানমন্ত্রী।
ফাস্ট রিটেইলিং কোম্পানির চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। জাপানের অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল মিতসুবিশি করপোরেশন, টয়োটা সুসো করপোরেশন, মারুবেনি করপোরেশন, আজিনোমোতো, নিক্কা কেমিক্যাল, টোকিউ কনস্ট্রাকশন, পেন্টা-ওশান কনস্ট্রাকশন, ইউগ্লেনা ও জাপান লজিস্টিকস সিস্টেমস।
নাগোয়াতে টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের সময় বাংলাদেশে টয়োটার কারখানা স্থাপন এবং গাড়ি ও অন্যান্য যন্ত্র উৎপাদনের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা তাদের আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে জাপানের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির সভাপতি এবং মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রত্যাশা জানান।
জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে বৈঠকে চলমান বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় সহজ শর্তে ঋণসহায়তা অব্যাহত রাখা ও কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার, জনস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক লেটার অব ইনটেন্ট এবং পরিবেশগত সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারকের আওতায় সরকারি-বেসরকারি সংলাপের উদ্যোগকে স্বাগত জানান তারা।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা, নির্বিঘ্ন নৌ চলাচল ও আকাশপথে উড্ডয়নের স্বাধীনতা, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, পণ্যের অবাধ সরবরাহ, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধান, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁরা আলোচনা করেন। ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত ও সংঘাতমুখী ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদারে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তারা।
সফরের অন্য কর্মসূচিতে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জাপানি বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা হয়। জাপানের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। সেখানে জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে যোগাযোগ, পরিবেশ, কৃষি, মানবসম্পদ, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনা, টেকসই অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন। তার মূল্যায়নে, উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখা ও বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে সফরটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়েছে।









