চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আউশ মৌসুমে আবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক। আবাদ কমায় প্রভাব পড়েছে চাল উৎপাদনেও। চলতি মৌসুমে ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ১৩ হাজার ৩৩৪ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চাল উৎপাদন নেমেছে সর্বনিম্নে। যদিও ১৩ বছরের ব্যবধানে আবাদ এবং উৎপাদন দুটিই কমেছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৪০ হেক্টরে আউশ আবাদ হয়েছিল যা থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৭০২ টন চাল উৎপাদন হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ মৌসুমে আবাদ হওয়া ৮৩ হাজার ৩৫৭ হেক্টর জমিতে চাল উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৫ টন। অর্থাৎ ১৩ বছরের ব্যবধানে আবাদ কমেছে ৮৮ হাজার ৩৮৩ হেক্টর জমি। আর উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৯০৭ টন চাল।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে আউশের জমি পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। তাছাড়া বিগত বছরগুলোয় পানির সংকট, বৃষ্টিপাত না হওয়া, তাপদাহ বেড়ে যাওয়া এবং আনুষঙ্গিক জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রতি বছর এ অঞ্চলে আউশ আবাদ কমে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদে লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ৯৬ হাজার ৬৯১ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়। অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ৮৩ হাজার ৩৫৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। বন্যায় প্রায় ১৩ হাজার ৩৩৪ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৫ টন চাল। বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৩ হাজার ১১৫ টন যা চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে সর্বনিম্ন।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় ৩৪ হাজার ১৯৯ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ৩২ হাজার ২৮১ হেক্টর। বন্যায় নষ্ট হয়েছে ১ হাজার ৯১৮ হেক্টর জমির ফসল। কক্সবাজার জেলায় ৩ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছিল। কিছু জমির ধান বন্যায় নষ্ট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ৩ হাজার ৬২৩ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত চাল দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১৮ টনে। এছাড়া নোয়াখালীতে ৩৭ হাজার ৪০০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছিল ৩২ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে। বন্যায় জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত আবাদ হয় ২৭ হাজার ৪১৮ হেক্টর জমিতে। জেলায় উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৭৭১ টন। ফেনীতে আবাদ হওয়া ৭ হাজার ৫৬৭ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছিল। বন্যায় ক্ষতি বাদে আবাদ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭০৯ হেক্টরে। এ জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৪৫ টন চাল। লক্ষ্মীপুরে ২৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও আবাদ হয় ১৮ হাজার ৯৭০ হেক্টর। তবে বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আবাদ দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৩২৬ হেক্টর জমিতে। বন্যার কারণে প্রায় ৪ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। জেলায় চাল উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৫৪১ টনে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে ধানের মৌসুমে আবাদ দেরিতে শুরু হয়। বিগত বছরগুলোয় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও পানি0সংকটের কারণে আবাদ কমছে আউশের। চলতি মৌসুমে কৃষি অঞ্চলে হঠাৎ অতিবৃষ্টি ও বন্যায় আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সার্বিকভাবে আবাদ ও উৎপাদন কমেছে। তাছাড়া জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়া, বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় আউশ আবাদে কৃষকের অনাগ্রহ বাড়ছে। তবে এ অঞ্চলে বোরো এবং আমন আবাদ ঊর্ধ্বমুখী।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. নাছির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আউশের আবাদ কমে যাওয়ায় উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। এ মৌসুমে ভয়াবহ বন্যার কারণে উৎপাদন আরো কমেছে। বন্যার কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রবি মৌসুমে তাদের প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। পরবর্তী মৌসুমগুলোয় কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে আমরা সব ধরনের পদক্ষেপ নেব।’










