রাজধানীর খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে রেললাইনে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী কোরবানির গরুর মাংসের বাজার। বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে পাওয়া মাংস এ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৬০০ টাকায়। আবার কসাইরা একটু ভালো মানের মাংস বিক্রি করছেন ৮০০ টাকায়। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভরসা হয়ে উঠেছে কম দামের এই বাজার।
শুধু খিলগাঁও নয়, রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার, শিয়া মসজিদ, মালিবাগ রেলগেট, রামপুরা ব্রিজসহ বিভিন্ন মোড়ে গড়ে উঠেছে স্বল্পমূল্যের এসব মাংসের বাজার। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সারাদিন বাসাবাড়িতে কোরবানির গরু কেটে পাওয়া মাংস বিক্রি করছেন কসাইরা। আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাওয়া মাংসের একটি অংশ বিক্রি করতে বাজারে এসেছেন ছিন্নমূল মানুষও। কারও হাতে ২ কেজি, আবার কারও হাতে ৫ কেজি মাংস। কেউ দাম বলছেন ২০০ টাকা, আবার কারও কাছে ভালো মানের মাংসের দাম ৪০০-৫০০ টাকা। দরদাম করে কিনছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।
খিলগাঁও রেললাইনের বাজারে ২০ কেজি মাংস নিয়ে এসেছেন মো. সুমন ও তার তিন সঙ্গী। ৭০০ ও ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তারা। সুমনের কাছে মাংসের বাজার নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর কোরবানির ঈদে ৫-৬টি গরু কাটি ও বানাই আমরা। এবারও ২০ হাজার টাকায় ৬টি গরুর কাজ নিয়েছি। সেখানে পারিশ্রমিকের পাশাপাশি প্রায় ৩৫ কেজি মাংস পেয়েছি। কিছু মাংস বাড়িতে নিয়ে যাব, বাকি ২০ কেজি বিক্রি করতে এসেছি। বড় গরুর মাংস এগুলো। কিনলে ঠকবেন না। এখানে মূলত আসেন যারা কোরবানি করতে পারেন না এমন মানুষরা। যাদের কোরবানি করার সামর্থ্য নেই, তারাও তো আজকের দিনে মাংস খেতে চান। তারা কম দামে কিছু মাংস কিনে নিচ্ছেন। এ বাজারে নির্দিষ্ট কোনো রেট নেই। যার কাছে যত বিক্রি করা যায়।’
সুমনের মতো কসাইদের মাংস দেখতে কিছুটা ভালো হলেও ছিন্নমূল অনেকের কাছে ভালো মানের মাংস নেই। তাদের কাছে থাকা মাংসের অধিকাংশই মাথা ও চামড়ার অংশের। আবার অনেকের কাছে রয়েছে পায়ের মাংস। ফলে এসব মাংস বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। তিন কেজি ৫০০ টাকায়ও দর দিতে দেখা গেছে।
তেমনি পাশের বস্তির এক নারী ৪ কেজি মাংস নিয়ে বসেছেন খিলগাঁওয়ের বাজারে। তিনি বলেন, ‘আমি ৫ কেজি মাংস পেয়েছি। এক কেজি বাচ্চাদের রান্না করে খাওয়াইছি। বাকিগুলো বিক্রি করতে এনেছি। কিছু টাকা পেলে সেটা দিয়ে কয়েকদিন চলতে পারব। তবে এখানে অনেক পরিচিত মানুষ আছে। তাদের দেখে সামনের দিকে যেতে পারছি না। আমি এক হাজার টাকা পেলে সব মাংস বিক্রি করে দেব।’
কম দামে গরুর মাংস কিনতে পেরে সন্তুষ্ট ক্রেতারাও। সাংবাদিকদের সামনে অনেকে কথা বলতে না চাইলেও পেটের টানে এসেছেন বলে জানান কয়েকজন। তেমনি একজন মাওলানা হামিদ। তিনি কোথায় চাকরি করেন, সেটি প্রকাশ করতে অস্বস্তিবোধ করছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘দেখেন, এখানে ২ কেজি মাংস ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আমরা যারা বাড়ি যেতে পারিনি, তারা এখান থেকে কিনে নিয়ে যেতে পারছি। আমি আড়াই হাজার টাকায় ৫ কেজি মাংস কিনলাম। কাল এগুলো নিয়ে বাড়ি যাব।’
অর্থকষ্ট না থাকলেও সবার পক্ষে কোরবানি সম্ভব নয় জানিয়ে এ ক্রেতা বলেন, ‘এবার দেখবেন মানুষ কোরবানি কম দিয়েছে। বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু আমাদের মজুরি সেইভাবে বাড়েনি। তাহলে কীভাবে কোরবানি দেব? সবার কাছে একসঙ্গে ২০-২৫ হাজার টাকা থাকে না। আর ঢাকায় এর কমে কোরবানি দেওয়াও যায় না। মানুষ পাওয়া যায় না। সে জন্য আমাদের ভরসা এসব বাজার। এখানে বড় গরুর ভালো মানের মাংসও পাওয়া যায়।’
কলেজপড়ুয়া এক ছাত্র খিলগাঁও রেললাইনের বাজারে মাকে নিয়ে মাংস কিনছেন। তিনি ২০০ টাকা ধরে তিন কেজি ও ৫০০ টাকা ধরে ১ কেজি মাংস কিনেছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৪ কেজি মাংস কিনেছি, সঙ্গে ২টি পা কিনেছি। সব একসঙ্গে রান্না করব। সামর্থ্য না থাকায় এবার কোরবানি দেওয়া হয়নি। তবুও তো মাংস খেতে হবে।’










