বরং গতকাল নগদ টাকার সংকট আরো বেড়েছে। রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান, বনানী, কারওয়ান বাজার এলাকার মতো প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর এটিএম বুথেও চাহিদা অনুযায়ী টাকা পাওয়া যায়নি বলে গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন। এক্ষেত্রে দেশের ভালো ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত প্রথম সারির ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথও রয়েছে।

ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ছাপানো অর্থ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনো ব্যাংক ৫০ কোটি টাকার চাহিদা দিলে ১০-১৫ কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকের এটিএম বুথের পাশাপাশি শাখায়ও নগদ টাকার সংকট চলছে। ইসলামী ব্যাংক ঘিরে বিরাজমান অস্থিরতা নগদ অর্থের সংকটকে আরো উসকে দিয়েছে। তবে অনলাইনে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দেশের অন্তত ছয়টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা প্রত্যেকে নগদ টাকা সংকটের বিষয়ে জানান। তবে এ বিষয়ে কেউ নিজের নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে নগদ অর্থের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ঈদের পরপরই বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা পরিশোধের কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুদ্রা সাময়িকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোয় নগদ অর্থের প্রবাহে সাময়িক চাপ পরিলক্ষিত হতে পারে। পরিস্থিতিকে সাময়িক বলে দাবি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকীর পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ঈদ-পরবর্তী সময়ে অর্থ পুনরায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসার মাধ্যমে তারল্য ও মুদ্রা সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রতি বছরই নগদ টাকার বাড়তি চাহিদা থাকে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সেটির জোগান দেয়া হয়। এবারের ঈদুল আজহার সময় ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদ টাকা (ছাপানো নোট) পাওয়া যায়নি। ২৫ মে টানা সাতদিনের সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার পর অনেক ব্যাংকেরই এটিএম বুথের টাকা শেষ হয়ে যায়। সে সময়ও নগদ টাকা না পেয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল।

সাধারণত ঈদুল আজহার ছুটি শেষে ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা জমা পড়ে। কিন্তু এবার ছুটি শেষে অফিস খোলার প্রথম দিন থেকেই ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে ব্যাংক খাতে অস্থিরতা চলছে। এর জেরে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার নগদ অর্থ তুলে নিয়েছেন আমানতকারীরা। গতকাল ব্যাংকটির সারা দেশের বেশির ভাগ এটিএম বুথে টাকা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার আমানত উত্তোলনের চাপে ইসলামী ব্যাংকের আরটিজিএস সেবাও বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংকটি থেকে গ্রাহকরা গতকাল ১ লাখ টাকার বেশি তুলতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, ব্যাংকগুলোয় নগদ অর্থের যে সংকট চলছে, সেটি তারল্য সংকট নয়। মূলত ছাপানো অর্থের সংকটের কারণে এটি তৈরি হয়েছে। মানুষ হাতে বেশি পরিমাণ নগদ অর্থ ধরে রাখছে। গত মার্চে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমানে এ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। চাহিদা মেটানোর মতো ছাপানো অর্থ এ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেই।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ছাপানো প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে তারা জানান, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংবলিত এ নোটগুলো বাজারে ছাড়া হয়নি। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নতুন ডিজাইনের যেসব নোট ছাপানো হয়েছিল, সেগুলো বাজারে ছাড়া হয়েছে। এ মুহূর্তে নতুন নোট ছাপাতে সময় লাগবে। চাহিদা সামাল দিতে আগের ছাপানো নোটগুলো থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোয় দেয়া হচ্ছে।