প্রস্তাবে নতুন স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় সরবরাহ, সেবা আমদানি এবং স্থান ও স্থাপনা ভাড়া, ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবা, মোবাইল ফোনের সিম কার্ড, সব ধরনের সার (ব্যবসায়ী পর্যায়ে) এবং হার্টের রিং ও চোখের লেন্স সরবরাহে প্রযোজ্য ভ্যাট হার সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়। পাশাপাশি কীটনাশক আমদানি ও কিডনি রোগীদের হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেট আমদানিতে প্রযোজ্য আগাম করও প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

এছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক কার, বাস ও ট্রাক, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনার ও মেট্রোরেল সেবাসহ কয়েকটি খাতে দেয়া ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বিপরীতে ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে মূসক নিবন্ধন গ্রহণ বা বিআইএন বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এমএস পণ্য বা রড উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে সুনির্দিষ্ট পরিমাণে আরোপিত ভ্যাটের আকার বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। এছাড়া বাজেটে তামাক পণ্যের ওপর খুচরা মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ভ্যাট খাতে প্রস্তাবিত এসব পরিবর্তন সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্প বিকাশে সহায়তা, কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, কমপ্লায়েন্স গ্যাপ হ্রাস, ভ্যাট হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি সহজীকরণ, দেশীয় শিল্প বিকাশে আইনের বিনিয়ন্ত্রিতকরণের মাধ্যমে একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং ইজ অব ডুয়িং বিজনেস নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে এসব পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।’

বাজেট প্রস্তাবে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সমগ্র দেশে এলাকা ও বাজারভিত্তিক ব্যবসার ধরন ও আর্থিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে ফ্ল্যাট রেট বা স্থির হারে সীমিত পরিমাণে সুনির্দিষ্ট টার্নওভার কর পরিশোধের বিধান করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। এ ব্যবস্থায় এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটসংক্রান্ত কোনো দলিলাদি বা হিসাবের খাতাপত্র সংরক্ষণ করতে হবে না এবং রিটার্ন দিতে হবে না।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এর ফলে হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর পরিশোধ সহজ হবে এবং জনগণ স্বপ্রণোদিত হয়ে গর্বিত করদাতা হিসেবে কর প্রদানে এগিয়ে আসবে। ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজে ঘরে বসেই ভ্যাট পরিশোধ করার ব্যবস্থা থাকায় একদিকে যেমন ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ভ্যাট প্রদানে উৎসাহী হবেন।’

বাজেটে ব্যাংক স্থিতির ওপর প্রযোজ্য আবগারি শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়। এজন্য ব্যাংক স্থিতির ওপর পরিশোধযোগ্য আবগারি শুল্ক (এক্সাইজ ডিউটি) অব্যাহতির সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকে একটি ঋণ হিসাবের বিপরীতে শুধু একবারই আবগারি শুল্ক কর্তনের বিধান প্রণয়নের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

বাজেটে দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্যম ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহ প্রদান এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। এছাড়া স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পরিশোধযোগ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা আমদানি এবং স্থান ও স্থাপনা ভাড়া গ্রহণে আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটও সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতির প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, যার মেয়াদ থাকবে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের দেয়া সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটও সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয় বাজেটে।

বর্তমানে টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আরোপিত করহার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি উল্লেখ করে তা ‘যৌক্তিক হারে’ কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। এর অংশ হিসেবে প্রতিটি মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকা হারে কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। এর প্রভাবে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা কমবে বলেও এ সময় জানান অর্থমন্ত্রী।

এ সময় কৃষিতে ব্যবহার্য সব ধরনের সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরোপিত সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। পাশাপাশি সব ধরনের কীটনাশকের আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম করও প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়।

বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা খাতে জনসাধারণের চিকিৎসা খরচ কমানোর লক্ষ্যে আমদানীকৃত হার্টের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের সরবরাহের ক্ষেত্রে জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এর ফলে প্রতিটি হার্টের রিং বা স্টেন্টের মূল্য কমবে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর চোখের প্রতিটি ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের দাম কমবে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। একই সঙ্গে কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার্য হেমোডায়ালাইসিসের ব্লাড টিউবিং সেট আমদানিতে প্রযোজ্য সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতিরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বাজেটে।

এ সময় জুয়েলারি সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশ মূসকের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট কর হিসেবে ভরিপ্রতি আড়াই হাজার টাকা নির্ধারণেরও ঘোষণা দেয়া হয়।

এ সময় মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে মূসক অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়। এছাড়া কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনার ইত্যাদি প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধাও একই সময় পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

বাজেট প্রস্তাবে পেট্রল ইঞ্জিনের পাশাপাশি হাইব্রিড গাড়ি, প্লাগইন হাইব্রিড গাড়ি, থ্রি হুইলার ও ফোর হইলার ইলেকট্রিক ভেহিকল, ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাকের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মূসক অব্যাহতি সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়। মেট্রোরেল সেবার ওপর মূসক অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।

এ সময় ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ারকন্ডিশনার ও কম্প্রেসরের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়।

ভ্যাটের আওতা বাড়াতে ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে মূসক নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে প্রতি লিটারে ৫০০ টাকা হারে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণেরও কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আমদানি পর্যায়ে উচ্চমূল্যের হিমায়িত মাছ, বৃক্ষ অথবা বৃক্ষের অংশ এবং সুগন্ধি বৃক্ষ নির্যাসের ওপর ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এমএস পণ্য বা রড উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে সুনির্দিষ্ট পরিমাণে আরোপিত ভ্যাটের আকার বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিলেট ও ইনগট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ বা শিট স্ক্র্যাপের ওপর টনপ্রতি ভ্যাট ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে দেড় হাজার টাকা করা হয়েছে। বিলেট ও ইনগট থেকে এমএস রড তৈরির ক্ষেত্রে ভ্যাট টনপ্রতি ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা এবং মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে তৈরি বিলেট বা ইনগটের ক্ষেত্রে তা টনপ্রতি ১ হাজার ৯০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ এবং মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে পাওয়া বিলেট/ইনগট ব্যবহার করে রড তৈরির ক্ষেত্রে আরোপিত ভ্যাটের পরিমাণ বাড়িয়ে টনপ্রতি যথাক্রমে ২ হাজার ১০০ টাকা এবং ৩ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া তামাক পণ্যের ব্যবহার হ্রাস এবং রাজস্ব বাড়াতে খুচরা মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেটে সিগারেটের প্রতি ১০ শলাকার সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য নিম্ন স্তরে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৯২, উচ্চ স্তরে ১৬০ টাকা ও অতিউচ্চ স্তরে ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন। নতুন পণ্য হিসেবে নিকোটিন পাউচের প্রতি ১০ গ্রামের খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা (৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক) এবং হিটেড টোব্যাকোর প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ২১০ টাকা (৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক) নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া অবৈধ তামাক পণ্য রোধে প্রযুক্তিনির্ভর ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালু, সিগারেটের স্ট্যাম্পে কিউআর বা এআর কোড স্থাপন এবং তামাক কারখানায় এআই ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে কঠোর নজরদারিরও প্রস্তাব করা হয়েছে।