বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশার বিদ্যমান সংকট নিরসনে গণমাধ্যমের রাজনৈতিকীকরণ বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকরা তাদের পেশাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে খুব সহজেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন— যা স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা।

আজ সকালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সের প্রথম প্ল্যানারি সেশনে বক্তব্য এসব কথা বলেন তিনি। মাহফুজ আনাম বলেন, বর্তমানে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মিডিয়ার পলিটিসাইজেশন বা রাজনৈতিকীকরণ।

মুক্ত ও দায়বদ্ধ গণমাধ্যম গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রাজধানীর কুর্মিটোলার রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুইদিনের এ কনফারেন্স। গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা এমআরডিআই-এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে দেশী-বিদেশী সাংবাদিক, কূটনীতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন

মাহফুজ আনাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা যারা সাংবাদিকতা করি, আমরা নিজেদের পেশাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না এবং খুব সহজেই রাজনীতির মধ্যে ঢুকে পড়ছি। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদের নেতৃত্বের ধরনেও পরিবর্তন আসে। কোনো নির্দিষ্ট সরকার ক্ষমতায় থাকলে একদল সাংবাদিক নেতৃত্বের সামনের সারিতে থাকেন, আবার সরকার পরিবর্তন হলে অন্য একদল সাংবাদিক দৃশ্যপটে আসেন। সাংবাদিকদের মূল আনুগত্য এবং ডিভোশন থাকা উচিত তাদের নিজেদের পেশার প্রতি, কোনো রাজনৈতিক আদর্শ বা দলের প্রতি নয়।’

মাহফুজ আনাম বলেন, সাংবাদিকতা স্বাধীনভাবে পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী ‘সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান’ গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বলেন, ‘একজন সম্পাদকের সেই নৈতিকতা, সাহস এবং পেশাগত মর্যাদা আছে কি-না, সেটাই বড় প্রশ্ন। সম্পাদককে অবশ্যই সংবাদপত্রের মালিকের পিআরও হওয়া উচিত নয়। মালিক সংবাদপত্রের স্বত্বাধিকারী হলেও সম্পাদকীয় নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্পাদককে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।’

মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অগ্রগতি নির্ভর করছে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর। দেশের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং সরকারী অর্থের অপচয় রোধ করতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অপরিহার্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পাবলিক রিসোর্সের সঠিক ব্যবহারের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম।

বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, অতীতের সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ ছিল তারা স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে দেয়নি। সরকারের নিজের সাফল্যের জন্যই স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন এবং সরকার ও সাংবাদিকতা একে অপরের পরিপূরক হওয়া উচিত।

পাশাপাশি সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষার অভাব নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মানহানি আইনের অপব্যবহার এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়াই হত্যা মামলা দায়ের করার বিষয়গুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতার পাশাপাশি বিচার বিভাগের সমর্থন ও সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। এই সংকট মোকাবেলায় সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগের সঙ্গে আলোচনা খুবই জরুরি।