শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থী বুলবুল আহমেদকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। এ ঘটনায় তার বন্ধু মার্জিয়া আক্তার ঊর্মির সম্পৃক্ততা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি তদন্তাধীন।

আজ বুধবার জালালবাদ থানায় দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা জানান সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ। 

তিনি জানান, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিন ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কামরুল নামের একজনের বাড়ি থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দেশীয় অস্ত্র ও নিহত বুলবুলের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার অন্য দুজন হলেন, আবুল হোসেন (১৮) ও মোহাম্মদ হাসান (১৮)। তাদের সবার বাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর সংলগ্ন এলাকায়। 

আজবাহার আলী শেখ জানান, ঘটনার দিন রাতেই আবুল হোসেনকে আটক করা হয়। এরপর তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী কামরুল ও মোহাম্মদ হাসানকে গ্রেফতার করা হয়। এ তিনজনকে ব্যাপকভাবে আলাদা আলাদাভাবে জিজ্ঞেস করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এরপর বুধবার বেলা ১১টায় অভিযুক্ত কামরুলকে সঙ্গে নিয়ে টিলারগাঁও এলাকায় তার বাড়িতে যায় পুলিশ। এ সময় কামরুলের ঘরের সানশেডের ভেতর থেকে একটি দেশীয় অস্ত্র (চাকু) ও নিহত বুলবুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

তবে কেন বুলবুলকে হত্যা করেছে, তাদের কি উদ্দেশ্য ছিল, মূল মোটিভ কী ছিল বা আরো কেউ জড়িত কিনা; এসব বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত সাপেক্ষে পরে জানানো হবে।

গতকাল মঙ্গলবার হত্যাকাণ্ডের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী নিহত বুলবুলের বন্ধু মার্জিয়া আক্তার ঊর্মির হাসপাতাল থেকে চলে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। পুলিশ একপর্যায়ে সিলেট শহতলীর বাদাঘাট এলাকায় তার সন্ধান পায়। গত রাত ৮টার দিকে ঊর্মিকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর ঘটনাস্থলে তাকে কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করার পর প্রক্টরের রুমে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে পুলিশ হেফাজত থেকে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শকের জিম্মায় দেয়া হয়।

তখন শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক আমিনা পারভীন সাংবাদিকদের বলেন, ঊর্মির দাবি, বুলবুল ও সে ঘটনাস্থলে বসে ছিলেন। হঠাৎ করে মাস্ক পরা ৩ ব্যক্তি সেখানে আসেন। তারা এসে বুলবুলকে একটু দূরে সরে নিয়ে যায়। এসময় ঊর্মি অন্যদিকে তাকিয়ে আশপাশে কেউ আছে কিনা দেখতে থাকে বুলবুলকে বাঁচাতে। পরে বুলবুলের দিকে তাকালে তাকে ছুরি মেরে রেখে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তখন সে হামলাকারীদের চিনতে পারেনি।

হাসপাতাল থেকে মার্জিয়া আক্তার ঊর্মির চুপিসারে যাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার আজবার আলী শেখ আরো জানান, তিনি হাসপাতাল থেকে চলে যাওয়ার পর আমরা তাকে খুঁজে পাই। এরপর ঊর্মি বলেছেন, তিনি শুনতে পেরেছেন বুলবুল আহমেদের জানাজা ক্যাম্পাসে হবে। সেখানে অংশ নেয়ার জন্য তিনি হাসপাতাল থেকে চলে গিয়েছিলেন। তিনি আসলে বুলবুলের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি। যার জন্য আপসেট ছিলেন।

অপরদিকে বুলবুল আহমেদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে আগামী সপ্তাহেই বুলবুলের পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আজ বুধবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন উপাচার্য। 

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আরো বলেন, ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ জায়গায়ই ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা আছে। যেসব জায়গায় এখনও ক্যামেরা নেই দ্রুত সেসব জায়গায় ক্যামেরা বসানো হবে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন উপাচার্য। 

প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে মেয়েদের আবাসিক হলের পার্শ্ববর্তী গাজিকালুর টিলায় বন্ধুকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী বুলবুল আহমেদ। এসময় তিনি দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতের শিকার হন। বুলবুলকে আহত অবস্থায় দেখতে পেয়ে শিক্ষার্থীরা তাকে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে রাত সাড়ে ৮টার দিকে বুলবুলের মৃত্যুর বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আবু হেনা পহিল। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার ইশফাকুল হোসেন সোমবার রাতেই বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় মামলা দায়ের করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক মিছিল সমাবেশ করেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতে নিহত বুলবুল আহমেদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।