এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সামাজিক সুরক্ষা খাতকে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে গতকাল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নেয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ই-হেলথ ও প্রবাসী কার্ডসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। এসব বাস্তবায়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
৪১ লাখ নারী পাবেন ফ্যামিলি কার্ড, বরাদ্দ সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা: আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার। এজন্য বাজেটে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডধারী নারীরা মাসে আড়াই হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন। মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে প্রায় ১৯ লাখ মা ও শিশুকেও।
বাজেট বক্তৃতায় এ বরাদ্দের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে সরকারের সিগনেচার প্রোগ্রাম ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। এর মাধ্যমে পরিবারের প্রধান নারী মাসে আড়াই হাজার করে ভাতা পাবেন। ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম দেশব্যাপী বিস্তৃত করা হবে। এরই মধ্যে পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগ্রহ ভাতা অব্যাহত রাখা হবে। মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার মা ও শিশুকে মাসে ৮৫০ টাকা করে দেয়া হবে। ক্যান্সারসহ ছয়টি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের এককালীন সহায়তা ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হবে। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ২০ হাজার টাকা অপরিবর্তিত থাকবে। তবে বাড়ানো হচ্ছে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের ভাতা ৫ হাজার টাকা করে বাড়িয়ে যথাক্রমে বীরশ্রেষ্ঠ ৪০ হাজার টাকা, বীর উত্তম ৩০ হাজার টাকা, বীর বিক্রম ২৫ হাজার টাকা এবং বীর প্রতীক ২৫ হাজার টাকা করা হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারদের মাসিক ২০ হাজার টাকা এবং এ, বি ও সি ক্যাটাগরিতে আহতদের যথাক্রমে ২০, ১৫ ও ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা অব্যাহত থাকবে।’
কৃষক কার্ডে ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব: প্রাথমিকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ বাবদ ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫ হাজার কৃষককে এ কার্ড দেয়া হবে এবং দেশের সব কৃষককে পর্যায়ক্রমে কৃষক কার্ড দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তর আনতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ১০টি সেবা পৌঁছে দিতে সরকার পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ (১৪ এপ্রিল ২০২৬) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে।’
সব নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড: সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ই-হেলথ কার্ড দেয়া হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতাহার অনুযায়ী আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছি। এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ই-হেলথ কার্ড দেয়া হবে। জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’ তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে। সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোয় কেন্দ্রীভূত করা হবে; করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটসহ অন্যান্য ব্যবস্থা থাকবে। তিনি আরো জানান, রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবের জন্য জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক গঠন করা হবে।
‘প্রবাসী কার্ড’সহ আরো যা থাকছে প্রবাসীদের জন্য: আগামী অর্থবছরে প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী জানান, প্রবাসীকল্যাণ সেবা, বীমা, ব্যাংকিং সুবিধা ও জরুরি সহায়তার সঙ্গে কার্ডটি সংযুক্ত করা হবে। ফলে প্রবাসীরা এক কার্ডের মাধ্যমেই সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আইনি সুরক্ষা ভোগ করতে পারবেন।
সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ ও প্রবাসী বাংলাদেশী জনশক্তির সুরক্ষা ও কল্যাণে বিএনপি সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এছাড়া বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ধরে রাখতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা, নতুন বিকল্প শ্রমবাজার সন্ধান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কিছু পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
মন্ত্রী জানান, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পেশাভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বিদেশে যেসব খাতে কাজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, সেগুলোর জন্য বিশেষ কোর্স ও পাঠ্যক্রম চালুর কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন ও সনদের মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।










