শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি হওয়ার পর থেকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণে গিয়েছেন রেকর্ড সংখ্যক পর্যটক। দীর্ঘদিন পর পর্যটন নগরী স্বরূপে ফেরায় ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। মূলত বছর শেষে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বার্ষিক সম্মেলন আয়োজনে বেছে নেয় কক্সবাজারকে। তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ায় অনেক অভিভাবকই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে যান কক্সবাজারে। ফলে পর্যটকের ভিড় বাড়ে সৈকত এলাকায়। এবারের বছর শেষের সময়টাও এর ব্যতিক্রম নয়।
একযোগে বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আনাগোনায় হোটেল-মোটেলসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক আবাসিক প্রতিষ্ঠানে রুম খালি নেই পর্যটন নগরী কক্সবাজারে । স্থান সংকুলান না হওয়ায় সম্মেলন কক্ষও ভাড়া দিয়েছে হোটেলগুলো। এমনকি সমুদ্র সৈকতের কিটকটে (ছাতায়) পর্যন্ত বসার সুযোগ মিলছে না। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেক পর্যটক।
পর্যটকদের ভিড়ে কক্সবাজার শহরের সড়কগুলোতে ট্রাফিক সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এমন অবস্থা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, হোটেল-মোটেল জোনে তারকা মানের হোটেলসহ নানা ক্যাটাগরির পাঁচ শতাধিক হোটেল রয়েছে। এসব আবাসনে দৈনিক ১ লাখ ৩০ হাজার পর্যটক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) হতে গড়ে সোয়া লাখ পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। আগামী ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যটকের এমন উপস্থিতি থাকবে বলে আশা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা, সড়কের যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে ট্যুরিস্ট ও ট্রাফিক পুলিশ।
শনিবার (২১ ডিসেম্বর) সকালে সুগন্ধা পয়েন্ট, ইনানী ও কলাতলী পয়েন্টে ঘুরে দেখা যায়, শীত উপেক্ষা করে সমুদ্রপাড়ে ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকরা। অনেকে সাগরের নোনা জলে গা ভিজাচ্ছেন, কেউ জেট স্কি নিয়ে মিতালি জমাচ্ছেন ঢেউয়ের সঙ্গে। কেউবা বাইকে চড়ে চক্কর দিচ্ছেন সৈকত পাড়ে।
উপস্থিত পর্যটকদের নিরাপত্তায় সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন টুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা। আর সমুদ্রে গোসলে নেমে যাতে বিপদে না পড়েন বিপদে না পড়েন পর্যটকরা, সেই তৎপরতায় কাজ করছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।
ঢাকার আশুলিয়া থেকে আসা অপু ওয়াহাব বণিক বার্তাকে বলেন, গত দুই দিন আগে কক্সবাজার এসেছি। সেদিন সকাল হতে সৈকতে ভ্রমণ পিপাসুদের ভিড় লেগে আছে। যারা অগ্রিম হোটেল বুকিং না দিয়ে এসেছে তারা পরিবার নিয়ে বিপদে পড়েছেন। নিয়মের চেয়ে বেশি ভাড়া দিতে চেয়েও অনেকেই রুম ভাড়া পাচ্ছেন না। আমরাও কক্সবাজারে রুম না পেয়ে টেকনাফে গিয়ে একরাত অবস্থান করছি।
খুলনা থেকে আসা শাহ আলম বলেন, ছুটির দিনে পর্যটকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় হোটেলের রুম ভাড়ায় তেমন ছাড় মেলেনি। রেস্তোরাঁসহ সবখানেই ভিড় এবং অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে।
হোটেল ওশেন প্যারাডাইসের ফ্রন্ট ডেস্কের ম্যানেজার আবদুল হান্নান বলেন, চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে শহরের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে রুমের চাহিদা বেড়েছে। গত আট মাস অনেকটা শূন্য ছিল পর্যটন নগরী। এখন ভিড় বাড়ছে। আমরা রুম ভাড়ায় সাধ্যমতো ছাড় দিচ্ছি। তবে অনেক পর্যটক আমাদের আগাম বুকিং না দিয়েই এসেছেন। তাই কেউ এসে হঠাৎ রুম চাইলে দুঃখ প্রকাশ ছাড়া কিছুই করার থাকছে না।
তারকা হোটেল কক্স-টু ডের সহকারি মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব বলেন, হোটেল কক্ষ খালি যাচ্ছে না। এ অবস্থা আরো সপ্তাহ-দশ দিন থাকতে পারে।
একই অবস্থা লাবনী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট, কলাতলী ছাড়াও মেরিন ড্রাইভের কিনারে গড়ে তোলা হোটেল-কটেজেও রুম ভাড়ায় তেমন কোনো ছাড় দেয়া হচ্ছে না। আবার ওয়াকিং পর্যটকরা রুমও পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিকরা।
টুরিস্ট পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম বলেন, লাখো পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে টুরিস্ট পুলিশের ৮৫ জন সদস্যকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সবার সতর্কতার কারণে এখনো পর্যন্ত কোনো হয়রানি কিংবা দুর্ঘটনার খবর আসেনি।
কক্সবাজার পুলিশের মুখপাত্র ও ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পর্যটকবাহী কয়েক হাজার যানবাহনের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়েছে। শহরের কলাতলী ডলফিন মোড়, বাইপাস সড়ক, প্রধান সড়কের বাজারঘাটায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য কাজ করছেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রুম ভাড়া কিংবা খাবারের মূল্য আদায়ের অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এসব বিষয় তদারকি করতে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে। পর্যটকদের হয়রানি কোনোভাবে বরদাশত করা হবেনা।










