তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পান ৯১ ভোট। আগামী এক বছর ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

এ জয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসছে বাংলাদেশ। এর আগে ১৯৮৬ সালে ৪১তম অধিবেশনে এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন। এটি বহুপক্ষীয় কূটনীতি, শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বিবৃতিতে এ সাফল্যের পেছনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব, স্বল্প সময়ে পরিচালিত সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের হাতে সময় ছিল মাত্র তিন মাস। এ সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক ফোরামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণা চালিয়েছে।

এ প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তাকে সহযোগিতা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পাশাপাশি নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে।

গত ১৩ মে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক ইন্টারঅ্যাকটিভ ডায়ালগকে প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সংলাপে ড. খলিলুর রহমান তার ভিশন ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন, যার পর প্রায় ৩০টি দেশের সমর্থন নিশ্চিত হয় বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশের প্রচারণায় বহুপক্ষীয়তা জোরদার, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

সরকার এ বিজয়ের জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং সংস্থাটির মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

নির্বাচিত হওয়ার পর অনুষ্ঠিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বক্তব্যের সুযোগ দেয়ার জন্য তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি বিনয় ও সম্মানের সঙ্গে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘‌এবারের অধিবেশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, কারণ এতে জাতিসংঘ সংস্কার, পরবর্তী বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডার প্রস্তুতি এবং নতুন মহাসচিব নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি সংকট এবং ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জগুলোও একই সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে।

তার ঘোষিত ছয়টি অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে—শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার; টেকসই উন্নয়ন ও এসডিজি ত্বরান্বিতকরণ; জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশ সুরক্ষা; মানবাধিকার, মানবিক সহায়তা ও অভিবাসন ইস্যু; ডিজিটাল শাসন ও প্রযুক্তি এবং নবায়িত বহুপক্ষীয়তা ও জাতিসংঘ সংস্কার।

তিনি জাতিসংঘ সনদ কঠোরভাবে অনুসরণ এবং সভাপতির আচরণবিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি তিনি সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য সমানভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

তিনি তার দপ্তরে ভৌগোলিক, লিঙ্গ ও ভাষাগত ভারসাম্য নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন এবং ছোট প্রতিনিধি দলগুলোর সহায়তায় বিশেষ কাঠামো তৈরির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।

এদিকে এক অভিনন্দন বার্তায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এ অর্জন বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশকে গর্বের সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সংযোগ, সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর তার ফেসবুক বার্তায় ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘‌পারস্পরিক অগ্রাধিকার ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা রয়েছে।’

চীনের ঢাকাস্থ দূতাবাস এক বার্তায় জানায়, এ নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা এবং বহুপক্ষীয়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের গঠনমূলক ভূমিকার প্রতিফলন। তারা আশা প্রকাশ করে, নতুন সভাপতি সব সদস্য রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে আরো সুসংহত করবেন।