গত বছর কোরবানির ঈদের ৪০ দিনের মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার পিস চামড়া আসে সাভারের ট্যানারিগুলোতে। এবার ৫৫ থেকে ৬৫ লাখ পিস চামড়া আসবে বলে ধারণা চামড়া শিল্পসংশ্লিষ্টদের।
সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ান জানান, গত বছর ৫০ লাখ পিসের মতো চামড়া প্রবেশ করেছিল ট্যানারিতে। এবারো কোরবানি করা পশুর ৬০-৭০ শতাংশ চামড়া প্রবেশ করতে পারে। সে হিসাবে ৫৫ থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ লাখ পিস চামড়া প্রবেশ করবে বলে তারা ধারণা করছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবার ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু কোরবানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ট্যানারি মালিকরা জানিয়েছেন, কোরবানির পরই তারা লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া সংগ্রহ শুরু করেন। তবে অনেক আড়তদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কাঁচা চামড়া কিনে সেটি লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখেন। ফলে কোরবানির তিন-চার মাস পরও সেসব চামড়া ট্যানারিতে আসে।
২০২৫ সালে কোরবানির ঈদ উদযাপিত হয় ৭ জুন। ওই বছরের ৭ আগস্ট বিকাল পর্যন্ত ৬ হাজার ১৭৭টি ট্রাকে ৪৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯১২টি চামড়া ট্যানারিতে প্রবেশ করে। যার মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া ছিল ৩২ লাখ ৮৪ হাজার ৮৩৭ এবং ছাগল ও ভেড়ার চামড়া ছিল ১২ লাখ ৬২ হাজার ৭৫টি।
প্রতিবারই চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে বেশ কয়েক বছর ধরেই কোরবানির পশুর দাম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় কম দামে কেনার অভিযোগ ট্যানারি ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। কোথাও কোথাও বিক্রি করতে না পেরে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার সংবাদও গণমাধ্যমে উঠে আসে।
এবার ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২-৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০-৬৫ টাকা। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৭-৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫-৬০ টাকা। এছাড়া খাসির লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২-২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যে দাম ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে একই হারে কার্যকর হবে।
তবে এবার ঈদের দিন রাজধানীসহ রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, বৃষ্টির প্রভাব পড়তে পারে কাঁচা চামড়ায়। চামড়ায় বৃষ্টির পানি পড়লে এর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। গরম বেশি পড়লেও একই সমস্যা হয়। শুরুতে বোঝা না গেলেও রাসায়নিকের ড্রামে দিলে সেটি ধরা যায়। সেজন্য এবার অনেক চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
সাভারের এবিএস ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমাম হোসেন বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমে যেমন চামড়ার মান নষ্ট হয়, অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও নষ্ট হয়। ঈদের প্রথম দশ দিন আমরা ঢাকার বাইরের চামড়া নেব না। ফলে আড়তদারদের দ্রুত লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করতে হবে। না হলে এ আবহাওয়ায় চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে। আর এসব চামড়া যখন আমরা রাসায়নিকের ড্রামে দেব তখন কোনো কাজে লাগাতে পারব না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এমনিতেই লোকসানে আছি। চামড়া সংরক্ষণ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যক্রম দেখছি না। এমনিতে চামড়ার দাম পাই না। ৪৫-৫০ সেন্টে চীনের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। আবহাওয়ার কারণে এবার যদি চামড়ার মান নষ্ট হয়, তখন লোকসানের বোঝা টানতে হবে।’
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন কোরবানির দিন সন্ধ্যার মধ্যে চামড়ায় লবণ লাগানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘সন্ধ্যার পর থেকে চামড়ার মান নষ্ট হতে থাকে। আর অতিরিক্ত গরম বা বৃষ্টি হলে আরো আগে থেকেই চামড়া নষ্ট হওয়া শুরু হয়। তাই যত দ্রুত সম্ভব লবণ লাগিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকেই চামড়ায় লবণ না লাগিয়ে সরাসরি ট্যানারিতে নিয়ে আসে। বিশেষ করে রাতের বেলা যে চামড়াগুলো নিয়ে আসা হয়, সেগুলোর অধিকাংশই আর ভালো থাকে না। তখন সরকারের নির্ধারণ করা দামে চামড়া কেনা সম্ভব হয় না।’










