রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে এ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।

মন্ত্রী বলেন, আমরা এ ঘটনা অত্যন্ত সিরিয়াসলি নিয়েছি এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আমরা আমাদের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্যের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি করেছিলাম। তাদের তিনদিনের সময় দেয়া হয়েছিল। আজ দুপুর ৩টায় সেই প্রতিবেদন আমরা হাতে পেয়েছি।

এ সময় তদন্ত প্রতিবেদনে কমিটির পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি উল্লেখ করেন, ভবনটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। যে কক্ষে ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, সেখানে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন না থাকায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের ঘাটতি ও কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে যায়। ওই কক্ষের দায়িত্বে থাকা সেবিকাদের দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল। নবজাতকের আকস্মিক শারীরিক অবনতিশীল অবস্থায় হাসপাতালের সক্রিয় ইমারজেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না। এমনকি অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স কোনো চিকিৎসককে বিষয়টি অবহিত না করে কালক্ষেপণ করতে থাকেন এবং নবজাতকদের মৃত্যু রোধে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি।

তিনি আরো বলেন, ওই কক্ষের আয়তন প্রায় ৯০০ বর্গফুট, যেখানে ১১ রোগী, নবজাতক ও রোগীর স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন ছিল, যা ধারণ ক্ষমতার অনেক বেশি।

মন্ত্রী বলেন, তদন্ত কমিটি হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রমাণ পেয়েছে, বিদ্যমান প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্ত পালনে সক্ষম ছিল না। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের দেখাশোনার জন্য কোনো চিকিৎসক ছিল না। ওই ওয়ার্ডে থাকা সেবিকাদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। ওই কক্ষে প্রয়োজনীয় আলো-বাতাস চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ওই কক্ষে রোগী ও তাদের স্বজনসহ অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। হাসপাতালটির ভেতরে কাচের ছোট ছোট কক্ষ নির্মাণের ফলে সেটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে ছোট বদ্ধ ঘরে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা, বিকল্প ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি ও কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে যাওয়া প্রভৃতিকে দায়ী করা হয়েছে।

এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমার আইনে যতটুকু কঠোর (হার্ড) হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাব। এবার আর কাউকে মাফ করে দেয়া যায় না।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধ ও অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। হাসপাতালটির যে পোস্ট অপারেটিভ রুমে এ ঘটনা ঘটেছে, সেটি আমরা ইতিমধ্যেই সিলগালা করে দিয়েছি। তবে পুরো হাসপাতালে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকায় হুট করে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। আমরা আগামী দুদিন বন্ধের মধ্যে আইন খতিয়ে দেখব এবং আগামী রোববারের মধ্যে হাসপাতালটির বিষয়ে চূড়ান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্তে পৌঁছাব।

হাসপাতালগুলোর এ লাগামহীন অব্যবস্থাপনা রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা যেভাবে সচিব, ডিজি এবং প্রতিমন্ত্রীসহ সবাই মিলে আকস্মিক পরিদর্শন কার্যক্রম সাজাচ্ছি এবং যে ধরনের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস—ভবিষ্যতে আর কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এভাবে বদ্ধ ঘরে মানুষ বা শিশু রাখার দুঃসাহস দেখাবে না।

তিনি আরো জানান, বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে এখন থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি ও ভবন পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি, যা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।

ছয় শিশুর মৃত্যুকে কেবল পেশাগত অবহেলা নাকি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এটি নিশ্চিতভাবেই একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ এবং এ ঘটনায় এরই মধ্যে মামলা হয়েছে। আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনরা শিশুদের মরদেহ নিয়ে গেছেন, যা আসামিরা আইনি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। তবে এটি রাতের আঁধারে ঘটা কোনো গোপন ঘটনা নয়, এটি শতভাগ প্রমাণিত সত্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আদালত আসামিদের কোনো ছাড় দেবেন না।

সবশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের নিয়ে আমরা একের পর এক জুম মিটিং করছি। আমাদের নির্দেশনা এবং ব্যবস্থাপনা দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর হবে, যা আপনারা শিগগিরই মাঠে দেখতে পাবেন।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।