কক্সবাজার থেকে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া দ্বীপে যাওয়ার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রুট বাঁকখালী নৌপথ। দিনে অন্তত ১০-১২ হাজার যাত্রী চলাচল করে এ নৌ-রুটে। নদীর নুনিয়াছড়া ৬ নম্বর ঘাট দিয়ে স্বল্প সময়ে যাত্রীরা মহেশখালী যাতায়াত করে। এ ঘাট দিয়ে স্পিডবোটে মাত্র ২০ মিনিটে মহেশখালীতে যাওয়া যায়। এজন্য মাত্র ১০০ টাকা ব্যয় হয় যাত্রীদের। তবে পলি পড়ে বাঁকখালী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় ভাটার সময় জেটি থেকে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। এতে স্পিডবোটসহ সব ধরনের নৌযান পরিচালনা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নৌ যাতায়াতের এ ভোগান্তির কারণে মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় যাত্রী চলাচল আশঙ্কাজনক হারে কমে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁকখালী নদী দখল, প্যারাবন ধ্বংস করা ও বর্জ্য ফেলার কারণে বাঁকখালী নদীর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদী দখলমুক্ত করতে একাধিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও শতভাগ দখলমুক্ত করা যায়নি। আবার কক্সবাজার বিমানবন্দর সমুদ্র অংশে সম্প্রসারণ করার পর নদীর মোহনা সংকুচিত হয়ে আসায় অভ্যন্তরেও পলি ভরাটের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। দখলমুক্ত করার পর প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ফের দখলের কারণেও দূষণ ও ভরাট বাড়ছে। এ কারণে নদীকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঘাট-পয়েন্টে চর ও পলি জমে নৌ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নিয়ন্ত্রণাধীন এ ঘাট প্রতি বছর ২ কোটি টাকার বেশি ইজারা মূল্য দিয়ে পরিচালনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রতিদিন ঘাট দিয়ে ১০-১২ হাজার যাত্রী চলাচল করে। নুনিয়াছড়া থেকে স্পিডবোটে যাত্রীপ্রতি ১০০ টাকায় মহেশখালী যেতে সময় লাগে মাত্র ২০ মিনিট। আবার লালবোট বা গামবোটে ৪০ টাকায় মহেশখালী যেতে সময় লাগে ৫০ মিনিট। অন্যদিকে সি-ট্রাকে ৩০ টাকায় মহেশখালী যেতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা। প্রতিদিন দুই দফায় ৩-৪ ঘণ্টা ভাটার কারণে নদীর একটি বড় অংশে পানি কমে যাওয়ায় পলিতে আটকে যায় নৌযান। এ কারণে অনেকেই যাত্রী ও মালামাল নিয়ে বিকল্প পথে মহেশখালী যাতায়াত করছে। কক্সবাজার থেকে চকরিয়া উপজেলা হয়ে মহেশখালী যেতে কয়েক ঘণ্টা সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি ৫০০-৬০০ টাকা ব্যয় হলেও নুনিয়াছড়া ঘাট ও বাঁকখালী নদীর পলির কারণে বাড়তি টাকা ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে যাত্রী, পর্যটক ও পণ্য পরিবহনকারী ব্যবসায়ীরা।

নৌযান মালিক-শ্রমিক ও ঘাট পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, প্রতি বছর বাঁকখালী নদী ড্রেজিং করার কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন করছে না বিআইডব্লিউটিএ। দুই বছরের বেশি সময় আগে ড্রেজিং করা হলেও এখন নদীর একটি বড় অংশে পলি জমেছে। নদীর দুই পাশে দখল, অবকাঠামো নির্মাণের কারণে নদীর ফোরশোর ক্রমেই ভরাট হয়ে আসছে। দ্রুত নদীর ড্রেজিং করার পাশাপাশি দখলে থাকা অংশ উদ্ধার করা না হলে নুনিয়াছড়া ঘাট বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল ওয়াকিল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নুনিয়াছড়া ৬ নম্বর জেটি ঘাটে পলি জমে যাওয়ার বিষয়টি আমরা অবগত রয়েছি। এখন পর্যন্ত ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ কিংবা আমাদের কাছে কোনো চিঠি দেয়া হয়নি। এর পরও অভিযোগ পাওয়া সাপেক্ষে আমরা ঘাটটি পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ড্রেজিংয়ের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেব।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের একটি বড় অংশই মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির ও পুরো দ্বীপ ভ্রমণ করে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বছরের দুই-তৃতীয়াংশ সময় যাতাযাত বন্ধ থাকে। সম্প্রতি সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ উন্মুক্ত করা হলেও পর্যটকদের রাত্রীযাপনে অনুমতি দেয়া হয়নি। এ কারণে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। সকালে যাত্রা শুরু করে ৬-৭ ঘণ্টা পর সেন্ট মার্টিন পৌঁছে মাত্র ২ ঘণ্টা পর ফেরত আসার নিয়মের কারণে একটি জাহাজও সেখানে যায়নি। কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের প্রধান গন্তব্য সেন্ট মার্টিন হলেও অবস্থানগত নিষেধাজ্ঞায় মহেশখালী ও কুতুবদিয়া দ্বীপের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু নদী ও জেটি ঘাটের পলির কারণে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া যেতেও বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন পর্যটকরা।

যাত্রীরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিসি ছয় মাস ধরে একটি সি-ট্রাক পরিচালনা করলেও জেটিতে ভিড়তে পারে না। অন্যান্য নৌযানের তুলনায় সাশ্রয়ী ভাড়া ও অধিক নিরাপদ হওয়ায় সি-ট্রাকের প্রতি যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ থাকলেও চলাচল করতে পারছে না অধিক যাত্রী বহনে সক্ষম নৌযানটি। সারা দেশে বিভিন্ন ড্রেজার নিয়মিত চর, পলি অপসারণে নিয়োজিত থাকলেও মহেশখালী-কুতুবদিয়া নৌ-রুটের চর অপসারণ নিয়ে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি ঘাটটির ইজারাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইফাত এন্টারপ্রাইজ বিআইডব্লিউটিএকে দেয়া এক চিঠিতে উল্লেখ করেছে, জেটি ও নদীর অভ্যন্তরে চর ও পলি জমার কারণে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। শীত মৌসুমের শুরুতে মহেশখালীতে পর্যটকদের আগ্রহ বেশি থাকলেও পলির কারণে দিনের একটি দীর্ঘ সময় নৌযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না। দ্রুত ড্রেজিং শুরু করে চর ও পলি অপসারণের পাশাপাশি দরপত্রের মাধ্যমে ইজারার শর্ত অনুযায়ী জমা দেয়া অর্থের ক্ষতিপূরণও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

জানতে চাইলে ইফাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. অলিউল্লাহ মিন্টু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে প্রতি বছর বাঁকখালী নদী ড্রেজিং করা হতো। দুই বছরের বেশি সময় ধরে ড্রেজিং করা হচ্ছে না। এ কারণে নদীর দুই পাশ ও জেটি ঘাট এলাকায় প্রচুর পলি জমেছে। আমরা বিভিন্ন সময় অভিযোগ জানিয়েছি। প্রতি বছর যাত্রী ও পণ্য পরিবহন থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করলেও নদীর ড্রেজিংসহ সংস্কার কাজ সম্পন্ন না করায় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি আমাদের লোকসান হচ্ছে।’