উপকূলীয় ছয়টি জেলায় মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল নৌপথ। পদ্মা সেতু চালুর পর এসব এলাকায় নৌযান চলাচলের পরিমাণ কমে আসে। পাশাপাশি ছোট-বড় অভ্যন্তরীণ সেতু ও সড়ক নির্মাণের ফলে ফিকে হয়ে আসছে ঘাটের চাঞ্চল্য। ফলে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বারবার দরপত্র দিয়েও ইজারাদার না পাওয়ায় উপকূলীয় ছয় জেলায় অর্ধশতাধিক ঘাটের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর জেলার মানুষের যোগাযোগের বড় নির্ভরতা ছিল নৌপথের ওপর। কয়েক বছর আগে পদ্মা সেতু নির্মাণের পর রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোর যাতায়াত সড়ককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। যার কারণে উপকূলীয় জেলাগুলোয় নৌযান, বিশেষ করে লঞ্চের সংখ্যা কমে যায়।

একসময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কিংবা উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী লঞ্চগুলোর অন্যতম মধ্যবর্তী গন্তব্য ছিল চাঁদপুর। এসব লঞ্চ চাঁদপুরের একাধিক ঘাটে নোঙর করে বিভিন্ন জেলার যাত্রী তুলত। কিন্তু গত কয়েক বছরে চাঁদপুরের ৪৩টির মধ্যে ছয়টি ঘাটে লঞ্চ কিংবা অন্যান্য যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান নোঙর করছে না। দশানি লঞ্চঘাট, নায়েরগাঁও লঞ্চঘাট, চরউমেদ বোরহান উদ্দিন বেপারী লঞ্চঘাট, ফরাজিকান্দি লঞ্চঘাট, কালিপুর লঞ্চঘাট ও মাছুয়াখালী লঞ্চঘাটের জন্য ১২ বার দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো ইজারাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানই অংশ নেয়নি। বাধ্য হয়ে এসব ঘাট বিলুপ্তি করতে মাঠ পর্যায় থেকে অনুরোধ জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।

চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বিআইডব্লিউটিএর ইজারা শাখার উপপরিচালক মো. মহিউদ্দিন খান সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী ও নৌ-সংরক্ষণ, পরিচালন বিভাগকে চাঁদপুর নদীবন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন ছয়টি ঘাট বা পয়েন্টে স্থাপিত পন্টুনসহ অন্যান্য স্থাপনা প্রত্যাহার করতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ছয়টি ঘাট বা পয়েন্ট ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ইজারা দেয়ার জন্য ১২ বার দরপত্র আহ্বান করেও কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কপথে ঢাকা থেকে যাতায়াত শুরু হওয়ায় জেলাগুলোর বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গেও সড়ক ও সেতু সংযোগ তৈরি হচ্ছে। যার কারণে ঘাট ইজারা নিয়ে লাভের আশা দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। এ কারণে অনেক ঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী লোকসানের ভয়ে দরপত্রে অংশ নিচ্ছেন না।

এদিকে বরিশাল নৌবন্দর সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল নৌবন্দরের অধীনে ১০০টির মতো ঘাট বা পয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার ২৫টির মতো ঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নৌযান চলাচল না করায় এরই মধ্যে ১৪টির মতো ঘাট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। আরো ১১টি ঘাট প্রত্যাহার করে পন্টুনসহ অবকাঠামো সরিয়ে নিতে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন বন্দর কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে বরিশাল নৌবন্দরের পোর্ট অফিসার মো. আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পর লঞ্চের চলাচল অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। আবার অভ্যন্তরীণ অনেক সড়ক, সেতু হয়ে যাওয়ায় নৌপথের যাতায়াত কমছে। এর ফলে এরই মধ্যে বেশকিছু ঘাটের অবকাঠামো সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আরো কিছু ঘাট উঠিয়ে নেয়ারও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

পটুয়াখালী নদীবন্দর সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে ৪০টির মধ্যে তিনটি ঘাট বিলুপ্তির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে তুলাতলী লঞ্চঘাট নতুন একটি স্থানে স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী নৌবন্দরের সহকারী পরিচালক জাকি শাহরিয়ার বলেন, ‘সড়ক যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় নৌপথের গুরুত্ব কমে আসছে। নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমলে আগামীতে ঘাটের ইজারামূল্য ও চাহিদা আরো কমে আসতে পারে।’

যোগাযোগ করা হলে বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (ইজারা) মো. মহিউদ্দিন খান বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের নৌঘাটগুলো এসব অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণ। কিন্তু দেশব্যাপী অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রভাবে অনেক ঘাটেই আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। এরই মধ্যে বেশকিছু ঘাট সরিয়ে নেয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাব আসা আরো কিছু ঘাট বিলুপ্ত করা হবে।’

বরগুনা নৌবন্দর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বরগুনায় আগে ১৮টি ঘাট বা পয়েন্ট ছিল। এক বছর আগে ভিকেখালী লঞ্চঘাট, কুরাঘাটা লঞ্চঘাট, আয়লা লঞ্চঘাট ও মোকামিয়া লঞ্চঘাটে নৌযান না আসায় বিলুপ্ত ঘোষণা করে পন্টুন ও অবকাঠামো সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

বিদ্যমান ১৪টি ঘাটে ইজারাদার নিয়োগ করা থাকলেও অনিয়মিত নৌযানের কারণে যাত্রীদের আনাগোনা কম। বরগুনা থেকে ঢাকায় আগে প্রতিদিন কয়েকটি লঞ্চ চলাচল করলেও বর্তমানে একদিন পরপর একটি লঞ্চ চলাচল করে। আগে আমতলী থেকে ঢাকায় লঞ্চ সার্ভিস খুবই জনপ্রিয় ছিল। এখন সার্ভিস একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যবর্তী অনেকগুলো লঞ্চঘাটেও যাত্রীদের চলাচল কমে গেছে। নৌযানের চলাচল কমে এলে বিদ্যমান ঘাটগুলোও নাজুক হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা।