প্রস্তাবিত বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গতকাল জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় এ ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায় আগমী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা।

বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এ বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন।

পুলিশের বরাদ্দ কমেছে ১০৮ কোটি টাকা: চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় আগামী অর্থবছরে পুলিশের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ কমেছে ১০৮ কোটি টাকা। পাশাপাশি পুলিশের নির্ধারিত ব্যয়সীমা থেকেও ৪৬২ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ কমেছে আবাসন, যানবাহন, জ্বালানি ও ভ্রমণ খাতে। গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে পুলিশের জন্য ১৮ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে পুলিশের বরাদ্দ ৩৩৭ কোটি টাকা বেড়েছে। কিন্তু পুলিশের বেতন বেড়েছে ৪৪৫ কোটি টাকা। ফলে প্রকৃত অর্থে পুলিশের পরিচালন বাজেট কমেছে ১০৮ কোটি টাকা। এর সঙ্গে নতুন পে-স্কেলের বেতন কাঠামো যোগ হলে পুলিশের বাজেটে আরো ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পুলিশের পরিচালন ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। কিন্তু বাজেটে ১৮ হাজার ৪৮ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত ব্যয়সীমার থেকে পুলিশের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ কমেছে ৪৬২ কোটি টাকা।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ কমেছে আবাসন নির্মাণে। আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণে বরাদ্দ নির্ধারণ করা ছিল ২৬৫ কোটি টাকা। আর প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা। মোটরযান কেনার জন্য ২৪০ কোটি টাকার ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হলেও প্রস্তাবিত বাজটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। একইভাবে জ্বালানি খাতে ৪৪ কোটি ও ভ্রমণে ৮৫ কোটি টাকা বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এছাড়া মূল বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ মিশনের জন্য পুলিশের যানবাহন কেনার ৩৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাবনাও ছিল। এ ধরনের গাড়ি জাতিসংঘ মিশনে সরবরাহ করে সরকার আর্থিকভাবে উপকৃত হয়ে থাকে।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার। দেড় দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৩৩ হাজার বেড়ে আড়াই লাখে পৌঁছেছে। এ সময়ের মধ্যে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ), বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) নামের বাহিনীর নতুন ছয়টি ইউনিট সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশে বর্তমানে সব মিলিয়ে কনস্টেবল রয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজারের মতো। তারা মূলত সরাসরি মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে কেউ কেউ থানায় যুক্ত থাকেন, কেউ আবার থাকেন রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে। বর্তমানে বাহিনীর মোট সদস্যের মধ্যে ১০ শতাংশের মতো আবাসন সুবিধা পান। বাকিরা থাকেন নিজ ব্যবস্থাপনায়।

পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ এসব খাতে বরাদ্দ কমিয়ে আনায় আবাসন ও যানবহান সংকট আরো বেশি প্রকট হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশের কাছে ভালো সেবা পেতে হলে সবার আগে তাদের স্বাস্থ্যকর আবাসনসহ মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌দীর্ঘ ডিউটির পর ভালো বিশ্রাম না পেলে তার প্রভাব পুলিশের কাজের ওপর আসে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা না করে লোকবল বাড়ালে বাহিনীতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। আবার থানাগুলোয় যানবাহন সংকটের কারণে টহল দিতে পারে না পুলিশ। এ সুযোগে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।’