বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘যাদের দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, পরিকল্পনা আছে, যারা বিদেশে পালিয়ে যায়নি, মানুষ তাদের ওপর ভরসা করে। এ মুহূর্তে বিএনপি একমাত্র রাজনৈতিক দল, যাদের অভিজ্ঞতা আছে দেশকে সামনের দিকে পরিচালিত করার। তাই দেশের মানুষ বিএনপি ও ধানের শীষের প্রতি আস্থা রাখতে চায়।’
গতকাল সিরাজগঞ্জের বিসিক শিল্প পার্কে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।
সিরাজগঞ্জ ছাড়াও এদিন তিনি টাঙ্গাইলেও নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন। এছাড়া বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ যাওয়ার পথে বগুড়ার শাজাহানপুর ও শেরপুর উপজেলায় পথসভায় বক্তব্য দেন। এর আগে বগুড়ায় নিজ নির্বাচনী এলাকার নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
সিরাজগঞ্জ: জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশ কৃষিনির্ভর। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ কৃষকদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হবে। এর জন্য কৃষক কার্ড দেয়া হবে।’
তারেক রহমানের মতে, দেশে যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার দরকার, তেমনি দরকার ভালো ক্রীড়াবিদও। যার যেমন মেধা তার বিকাশ ঘটাতে বিএনপি পরিকল্পনামাফিক সামনে এগোবে। সফল ও ভালো ক্রীড়াবিদরা যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে পারেন তার জন্য বিএনপি কাজ করবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন এবং অন্য ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা চালু করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন আগামী দিনে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, ভোটের অধিকারর কেউ কেড়ে নিতে না পারে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘জাতপাতের বালাই না রেখে দেশের সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। গত ১৫-১৬ বছরে দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী নির্যাতন, গুম ও খুনের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক, কথা বলার ও ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাই জুলাই আন্দোলনে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছে। মৃত্যু ও পঙ্গুত্ববরণ করেছে। আমাদের তাদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করতে হবে।’
বিএনপি শান্তিতে বিশ্বাস করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় হলে আমরা জনগণের সরকার ও জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন করব।’
সিরাজগঞ্জ-পাবনাসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ছোট, ছোট শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে হবে, বেকার তরুণদের আইটি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মক্ষম করে গড়ে তুলেতে হবে। নতুন নতুন শিল্প পার্ক স্থাপন, কৃষিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠা ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট স্থাপনের মাধ্যমে বেকার সমস্যার সমাধান করা হবে।’
বিএনপি চেয়ারম্যান নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আগামীতে ধানের শীষ বিজয়ী হলে সরকার ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করবে। উত্তরবঙ্গ কৃষিপ্রধান এলাকা। তাই এ এলাকায় কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলবে। সিরাজগঞ্জ ও পাবনার তাঁত শিল্পের উন্নয়ন ও তাঁতপণ্য রফতানির উদ্যোগ নেয়া হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আগামীতে দেশের মানুষকে ভালো ও নিরাপদে রাখতে পারলে আমাদের সব আন্দোলন সফল ও চাওয়া পূরণ হবে।’ এজন্য তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করেন।
এদিকে প্রায় ১৯ বছর পর তারেক রহমান সিরাজগঞ্জে আগমনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়। ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি সর্বশেষ সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল ধোপাকান্দি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন।
বেলা ২টায় তারেক রহমানের সিরাজগঞ্জে পৌঁছার কথা থাকলেও তিনি সভাস্থলে এসে পৌঁছেন বেলা সাড়ে ৩টায়। জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য রুমানা মাহমুদের সভাপতিত্বে জনসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ সিরাজগঞ্জ ও পাবনার প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
টাঙ্গাইল: বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আগামী দিনের রাজনীতি হবে মানুষের ভাগ্য গড়ার ও দেশের উন্নয়নের রাজনীতি।’ গতকাল সন্ধ্যায় যমুনা সেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে টাঙ্গাইল সদরের দরুন-চরজানা বাইপাস এলাকার মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘অনেক রক্ত দিয়ে আমরা পুনরায় স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের দিন। গত ৫ আগস্ট যেভাবে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল সেইভাবে ১২ তারিখে ভোট দিতে আসতে হবে। আগের দিন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে ভোট দেয়ার। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন কোনো ষড়যন্ত্র করে কেউ আবার এ ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই টাঙ্গাইল থেকে তৈরি তাঁতের শাড়ি-টুপি বিভিন্ন দেশে যায়। আমরা পরিকল্পিতভাবে যদি চেষ্টা করি তাহলে বিদেশের বাজার ধরতে পারি। আপনাদের এলাকায় প্রচুর আনারস চাষ হয়। টাঙ্গাইলে নতুন করে পাট শিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে চেষ্টা করলে এসব পণ্য বিদেশে রফতানি করা সম্ভব।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আজকে যদি ২০ কোটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হয়, তাহলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিলের সভাপতিত্বে নির্বাচনী জনসভায় টাঙ্গাইলের আটটি সংসদীয় আসনের ধানের শীষের প্রার্থীরা বক্তব্য দেন। জনসভা পরিচালনা করেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের দলীয় প্রার্থী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
পরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জেলার আটটি আসনের দলীয় প্রার্থীকে জনসাধারণের সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ধানের শীষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান।
টাঙ্গাইলে জনসভা শেষ করে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিএনপির চেয়ারম্যান ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
বগুড়া: দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ যাওয়ার পথে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের শাজাহানপুর উপজেলার মাঝিড়া বন্দরে পথসভায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের ঘরের সন্তান তারেক বলছি। বহু বছর পর আপনাদের এলাকায় এসেছি। এর আগে যখন আসতাম তখন এলাকা ঘুরে ঘুরে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতাম, কাজ দেখতাম।’
এ সময় বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মোরশেদ মিল্টনের পক্ষে ভোট চেয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের এ এলাকার উন্নয়নসহ মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখভালের জন্য আমি মিল্টনকে দায়িত্ব দিয়ে গেছি। আপনারা ১২ তারিখে মিল্টনকে জয়যুক্ত করবেন। মিল্টনের মাধ্যমে গাবতলী ও শাজাহানপুর এলাকার মানুষের যত কাজ ইনশা আল্লাহ আমরা করব।’
তারেক রহমান আরো বলেন, ‘আজকে আমাকে ছেড়ে দেন। আজকে যাই। আমি তো ঘরের ছেলে। ইনশা আল্লাহ দুদিন পর আবারো আসব। আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন দেশের জন্য কাজ করতে পারি।’
বগুড়া-৭ আসনের গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে তারেক রহমানের পৈতৃক বাড়ি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এবারো খালেদা জিয়ার পক্ষে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছিল। তবে তার মৃত্যুতে এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টন।
পরে বেলা দেড়টার দিকে বগুড়ার শেরপুর উপজেলা শহরের ধুনট মোড়ে পথসভায় বগুড়া-৫ (শেরপুর ও ধুনট) আসনে বিএনপির প্রার্থী গোলাম মো. সিরাজের জন্য ভোট চান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘বহু বছর পর আবারো আপনাদের কাছে ফিরে এসেছি। এজন্য আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া। আগামী ১২ তারিখে দেশে বহুপ্রত্যাশিত নির্বাচন। অতীতে প্রত্যেকটি নির্বাচনে শেরপুর-ধুনটবাসী ধানের শীষকে জয়যুক্ত করেছে। যতবার ধানের শীষ জয়যুক্ত হয়েছে, ততবার শেরপুর-ধুনট এলাকার উন্নয়ন সাধনে ধানের শীষ সচেষ্ট থেকেছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এলাকার সন্তান হিসেবে আপনাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে, ইনশা আল্লাহ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী সিরাজ সাহেবকে (গোলাম মো. সিরাজ) আমরা জয়যুক্ত করব। পথসভা শেষে বিএনপির চেয়ারম্যান সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
এর আগে বেলা ১১টায় বগুড়ার হোটেল নাজ গার্ডেনের বলরুমে নিজ নির্বাচনী এলাকা বগুড়া-৬ (সদর) আসনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি বলেন, ‘বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি। এ ঘাঁটির দায়িত্ব আপনাদের সঁপে দিলাম। এ ঘাঁটিকে দেখে রাখবেন। এ ঘাঁটির জনগণকে দেখে রাখবেন। এ ঘাঁটির দায়িত্ব আপনাদের। এ ঘাঁটির দায়িত্ব আপনাদের দিয়ে গেলাম।’
সভার শুরুতে স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য শোনেন তিনি। পরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো কোনো বক্তা বলেছেন, ভোটারের কাছে না গেলেও এখানে ধানের শীষ বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বসে থাকলে চলবে না, সবার কাছেই যেতে হবে। বগুড়ার সাতটি আসনে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করতে হবে।’
বিএনপির চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘অতীতে নানা সময়ে আপনাদের কাছে এসেছি। এবার বগুড়া-৬ আসনের প্রার্থী হয়ে এসেছি। তবে আমার নির্বাচন করার দায়িত্ব আপনাদের। কারণ সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণায় আমাকে যেতে হচ্ছে।’
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিমের (বাদশা) সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সহিদ-উন-নবী ও খায়রুল বাশার। সভায় বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বগুড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র একেএম মাহবুবুর রহমান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বগুড়া-৭ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলাম, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন এবং আলী আজগর তালুকদার, বগুড়া শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী, বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান প্রমুখ বক্তব্য দেন।









