ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকায় ভিডিও গেম এখন সফট পাওয়ার বা কূটনীতির একটি কার্যকর হাতিয়ার।
সম্প্রতি প্রকাশিত পাওয়ার প্লে নামের বইয়ে গেমিং শিল্প বিশ্লেষক জর্জ ওসবর্ন দেখিয়েছেন, কীভাবে ভিডিও গেম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে। চীন ও সৌদি আরবসহ অনেক দেশের সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য গেমিং খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।
জর্জ ওসবর্ন বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের সরকার শিল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে গেমের মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে, আবার কোথাও এটিকে জনগণের ওপর নজরদারি ও রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ২০২৪ সালে এর একটি উদাহরণ দেখা যায়। ওই সময় ব্রিটিশ জরিপ প্রতিষ্ঠান জেএল পার্টনার্স সবচেয়ে নির্ভুলভাবে নির্বাচনের ফলাফলের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়। প্রতিষ্ঠানটি তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় মোবাইল গেমের মাধ্যমে পরিচালিত জরিপ থেকে।
জেএল পার্টনার্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেমস জনসন বলেন, ‘অনেক মানুষ প্রচলিত জরিপে অংশ নিতে চান না বা সময় পান না। কিন্তু গেম খেলার সময় তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ফলে এমন ভোটারদের মতামত পাওয়া গেছে, যাদের সাধারণ জরিপে পাওয়া কঠিন।’
জর্জ ওসবর্নের ভাষায়, ডিজিটাল জগতের ঘটনার প্রভাব বাস্তব জীবনেও পড়ে। ফলে ভিডিও গেমকে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এ প্রতিযোগিতার অন্যতম উদাহরণ সৌদি আরব। দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গেমিং খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। গত বছর সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স এবং সিলভার লেকের সঙ্গে মিলে ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রনিক আর্টস (ইএ) অধিগ্রহণের চেষ্টা করে। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাটলফিল্ড, দ্য সিমস ও ম্যাডেনের মতো জনপ্রিয় গেম তৈরি করে।
পাশাপাশি সৌদি আরব পোকেমন গো ও মনোপলি গোয়ের মতো জনপ্রিয় গেমে বিনিয়োগ করেছে। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেশাদার ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্ট আয়োজনকারী একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌদি আরব নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থানও মজবুত করতে চায় দেশটি।
চীনও গেমিং শিল্পকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৭০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ভিডিও গেম খেলে। এ বিশাল বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে কঠোর নীতিমালা চালু করেছে চীন সরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনে কোনো গেম বাজারে ছাড়ার আগে সরকারি অনুমোদন নিতে হয়। চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেনসেন্টও বিশ্ব গেমিং শিল্পে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বালডার্স গেট ৩, অ্যাসাসিনস ক্রিড ও ডার্ক সোলসের মতো জনপ্রিয় গেমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব জাপানের নিনতেন্দো, ক্যাপকোম ও সুইডেনভিত্তিক এমব্রেসার গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিনিয়োগের ফলে গেমিং শিল্পে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। তুলনামূলকভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারি বিনিয়োগ অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিডিও গেম এখন বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজিটাল শিল্প। এটি বিনোদনের পাশাপাশি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, কূটনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে গেমিং শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এর ভূরাজনৈতিক প্রভাবও।










