প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেছেন, একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে, যা সবাইকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি বিদ্যমান নীতিমালাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন করা গেলে নাগরিক সেবার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরো সহজতর হবে এবং বর্তমান সরকার এ বিষয়টিকে অধিক হারে প্রাধান্য দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ, রফতানি পরিসংখ্যানসহ অন্যান্য তথ্যে বেশ অসংগতি ছিল, যা নিরসনে বর্তমান সরকার বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, কারণ সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া কখনোই যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, যার কার্যক্রম অব্যাহত আছে, যেখানে দেশের সকল স্তরের নাগরিকদের পাশাপাশি বিশেষ করে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা নিজেদের প্রত্যাশার প্রস্তাব পেশ করতে পারে, যার ভিত্তিতে সংষ্কার কার্যক্রম আরো জোরালো হবে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিসিআই) সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেছেন, তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, সফটওয়্যার এবং যন্ত্রপাতিসহ তথ্যপ্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, তবে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও আমাদের আয় ২.৫ বিলিয়ন ডলার, যা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

শনিবার (৯ নভেম্বর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিসিআই) উদ্যোগে ‘তথ্য-প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের পর তথ্য-প্রযুক্তি খাত অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, যেখানে বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী বিনিয়াগ সম্প্রসারণ সম্ভব। তিনি বলেন, দেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের অনুমতি প্রদান প্রক্রিয়া সহজীকরণের লক্ষ্যে বিডার পক্ষ থেকে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুর্নীতি হ্রাস করা সম্ভব। তিনি আরো জানান, বিডার ফ্রন্ট অফিসে একজন রিলেশনশীপ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে, যার কাজ হবে সিঙ্গেল ডেস্ক থেকে বিনিয়োগকারীদের সমস্ত পরিষেবা দ্রুত প্রদান করা।

সূচনা বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, সফটওয়্যার এবং যন্ত্রপাতিসহ তথ্যপ্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, তবে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও আমাদের আয় ২.৫ বিলিয়ন ডলার, যা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, এ খাতে আমাদের কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চতর মূল্য সংযোজন পরিষেবা প্রদানের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে এবং সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনে উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারিত করতে হবে। এছাড়াও পণ্যের ডিজাইন, অ্যাসেম্বলি প্যাকেজিং এবং টেস্টিং (এপিটি) প্রভৃতি খাতে আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং এক্ষেত্রে উদীয়মান আইওটি বাজারের জন্য ইন্টিগ্রেটেড ডিভাইস ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের (আইডিএম) সুযোগগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন, যথাযথ বাস্তবায়ন, কৌশলগত বিনিয়োগ, সরকারি ও বেসরকারি খাতসহ সব অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বলেন, সফটওয়্যার ও পরিষেবা রফতানি ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং ২০২৪ অর্থবছরে রফতানি আয় প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ খাতে দক্ষতার ব্যবধান এবং পরিকাঠামোর অভাবের কথা উল্লেখ করে আশরাফ আহমেদ বলেন, এই ব্যবধান মেটাতে শিক্ষা, লজিস্টিক পরিকাঠামো এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু উচ্চমানের মূল্য সংযোজন তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার জন্য তিনি গবেষণা ও উন্নয়ন এবং রফতানি প্রণোদনার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর লক্ষ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন, যথাযথ বাস্তবায়ন, কৌশলগত বিনিয়োগ ও সরকারি, বেসরকারি খাতসহ সব স্টেকহোল্ডারের মধ্যকার সমন্বয় একান্ত অপরিহার্য বলে ডিসিসিআই সভাপতি মত দেন।

বন্ডস্টেইন টেকনোলোজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর শাহরুখ ইসলাম সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ২ হাজার ৬০০টিরও বেশি আইটি কোম্পানি কাজ করছে যা ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে এবং এ খাতের বাজারের আকার ২.৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিনি জানান, বর্তমানে ৪৫০টি বাংলাদেশী কোম্পানি তাদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানি করছে। তিনি বলেন, সফ্টওয়্যার পরিষেবার সীমিত সুযোগের সঙ্গে বাংলাদেশের ডিভাইস উৎপাদন ক্ষমতা নেই। তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে আইটি পণ্যের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, রফতানি বাড়াতে তিনি স্থানীয় আইসিটি কোম্পানিগুলোকে বিদেশে অফিস স্থাপনের অনুমতি দেয়া এবং আইসিটি পণ্য রফতানিতে প্রণোদনা পুনঃস্থাপনের সুপারিশ করেন। তিনি আরো বলেন, আইসিটি উদ্যোক্তারা সহায়ক নীতির অভাব এবং ঋণ প্রাপ্তিতে কঠোর জামানত প্রক্রিয়া মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এ খাতের বিকাশে পণ্যের মেধাস্বত্ব অধিকারের সুরক্ষা অতীব জরুরি।

সেমিনারের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (আইসিটি) মোহাম্মদ জাকির হাসান, বেসিসের প্রাক্তন সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান ও ওয়ালটন ডিজি টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লিয়াকত আলী অংশ নেন।

ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী মুক্ত আলোচনা সঞ্চালনা করেন। এ সময় ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মো. জুনায়েদ ইবনে আলী, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ সরকারি-বেসরকারি খাতের আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।