টানা তিন মাস ধরে সংকোচনের ধারায় চলার পর গত অক্টোবর মাসে সম্প্রসারণের ধারায় ফিরেছিল দেশের অর্থনীতি। জুন মাসের পর অক্টোবর মাসে প্রথম দেশের অর্থনীতির প্রধান চারটি খাত—কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাত একসঙ্গে সম্প্রসারণের ধারায় ফেরে। তবে নভেম্বর মাসে আবার সংকোচনের ধারায় ফিরেছে নির্মাণ খাত। বাকি তিনটি খাত অবশ্য সম্প্রসারণের ধারায়ই রয়েছে। এ মাসের সার্বিক পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) মান আগের মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ৫ পয়েন্ট বেড়ে ৬২ দশমিক ২ পয়েন্টে পৌঁছেছে। জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর দেশের অর্থনীতির সর্বোচ্চ মান এ মাসে দেখা গেছে।

শনিবার (৭ ডিসেম্বর) যৌথভাবে নভেম্বর মাসের পিএমআই মান প্রকাশ করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি)। প্রতি মাসেই তারা এ সূচক প্রকাশ করে থাকে। ১০০-এর মধ্যে পরিমাপ করা পিএমআই মান ৫০-এর নিচে হলে দেশের অর্থনীতি সংকোচন গতিতে চলছে বলে ধরে নেয়া হয়। আর ৫০-এর ওপরে হলে অর্থনীতি সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে বলে বোঝানো হয়।

পিইবি ও এমসিসিআই জানায়, পিএমআই একটি অগ্রণী উদ্যোগ, যা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সময়োপযোগী ও সঠিক বিশ্লেষণ প্রদান করে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। যুক্তরাজ্য সরকারের সমর্থন ও সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের (এসআইপিএমএম) কারিগরি সহায়তায় পিএমআই মান তৈরি করা হয়েছে।

নভেম্বর মাসের পিএমআইতে দেখা যায়, উৎপাদন খাতে আগের মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ পয়েন্ট বেড়েছে পিএমআই মান। নভেম্বর মাসের উৎপাদন খাতের পয়েন্ট ৬০ দশমিক ৯। সেবা খাত ৭ দশমিক ১ পয়েন্ট বেড়ে ৬৪তে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে কৃষি খাতে। আগের মাসের তুলনায় ১৪ দশমিক ১ পয়েন্ট বেড়ে ৬৭ দশমিক ২ পয়েন্টে পৌঁছেছে কৃষি খাত। অক্টোবরে এ খাতের মান ছিল ৫৩ দশমিক ১।

উৎপাদন, সেবা ও কৃষি খাতের অর্থনীতি উন্নতির পথে থাকলেও অবনতির দিকে গেছে নির্মাণ খাতের মান। অক্টোবর মাসের ৫০ দশমিক ১ পয়েন্ট থেকে শূন্য দশমিক ৫ পয়েন্ট কমে সংকোচনের ধারায় ফিরে গেছে এ খাতটি। তবে পিএমআই মান অনুযায়ী সব মিলিয়ে আগের মাসের তুলনায় উন্নতির দিকে আছে দেশের অর্থনীতি।

নির্মাণ খাত সংকোচনের ধারায় ফেরার কারণ হিসেবে পিএমআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইনপুট খরচ এবং ক্রয়াদেশ বকেয়া থাকার কারণে এ খাত সংকোচনের দিকে গিয়েছে। তবে নতুন ব্যবসা, নির্মাণ কার্যক্রম এবং কর্মসংস্থানের সূচকে সম্প্রসারণ ধারা রয়েছে।

নভেম্বরের পিএমআই মান সম্পর্কে সার্বিকভাবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা তিন মাসের সংকোচনের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি টানা দ্বিতীয় মাস ধরে সম্প্রসারণ বজায় রাখছে। তবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতি এখনো বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং শিল্প ও অন্যান্য বিক্ষোভ থেকে উদ্ভূত ব্যাঘাতের মুখোমুখি হচ্ছে।

গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এমসিসিআই ও পিইবি পিএমআই মান প্রকাশ করা শুরু করলেও তা জনসম্মুখে আনা হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরু থেকেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, যা মে মাসে রেকর্ড ৭০ দশমিক ১-এ পৌঁছায়। তবে এর পর থেকে পিএমআই মান কমতে শুরু করে এবং জুলাই মাসে এটি ৩৬ দশমিক ৯ পয়েন্টে নেমে আসে। ওই সময় দেশজুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে সব খাতের মানেই ধস নেমেছিল।

তবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে শুরু করে। এ ধারায় পিএমআই মান আগস্টে ৪৩ দশমিক ৫, সেপ্টেম্বরে ৪৯ দশমিক ৭ এবং অক্টোবরে ৫৫ দশমিক ৭-এ উন্নীত হয়। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে এ মান আরো বেড়ে ৬২ দশমিক ২ পয়েন্টে পৌঁছায়।