তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় “গিয়ার শিফট” করা প্রয়োজন। বর্তমান গতিতে কাজ করলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে, কারণ অন্যান্য দেশ আরো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি এতদিন সেকেন্ড গিয়ারে চলতাম, আমাদের এখন আসলে ফিফথ গিয়ারে গাড়ি চালাতে হবে।’ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা কার্যালয়ে গতকাল এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান এ কথা বলেন।
ইউএনসিটিএডি ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ (আইপিআর) ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের বিনিয়োগ নীতি সংস্কারে গতি আনতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) ও বিডার অংশীদারত্বে এ রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ইউএনসিটিএডির ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ বিভাগের লিগ্যাল অফিসার কিয়োশি আদাচি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এফডিআই স্টক ছিল ১ হাজার ৮২৯ দশমিক ৪ কোটি ডলার। একই সময় ভিয়েতনামের এফডিআই স্টক ছিল ২৪ হাজার ৯১৪ দশমিক ১ কোটি ডলার, কম্বোডিয়ার ছিল ৫ হাজার ২৬৬ দশমিক ৭ কোটি ডলার ও ইন্দোনেশিয়ার ৩০ হাজার ৫৬৬ দশমিক ৬ কোটি ডলার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছিল ১৮০ কোটি ডলারের বেশি। কিন্তু ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। ফলে কভিড-১৯ মহামারীর শুরুর সময়ের তুলনায়ও এফডিআইয়ের প্রবাহ হ্রাস পায়। তবে এ সময়ে দেশে এফডিআই স্টক মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল, যা প্রায় ১৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়। এসব কারণে সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা কাজ করছি, কিন্তু সেই কাজের আউটপুট আসছে না। হয় আমরা ঠিকভাবে কাজ করছি না, অথবা যেসব কাজ করছি তা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না।’
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বাড়ানো, সরকারি সেবা সহজ ও ডিজিটাল করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি একক প্লাটফর্ম ও সেবা কেন্দ্র থাকা জরুরি, যেখানে সব ধরনের অনুমোদন, লাইসেন্স ও নিবন্ধন সম্পন্ন করা যাবে।’
চৌধুরী আশিক আরো বলেন, ‘দেশে পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন তৈরি করা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। আমরা অনেক পরিকল্পনা করি, সুন্দর প্রতিবেদন তৈরি করি, কিন্তু পরে দেখা যায় সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না।’
ইউএনডিপির ডেপুটি আবাসিক প্রতিনিধি সোনালি দয়রত্নে বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য শুধু সংস্কারের ইচ্ছা নয়; কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার, যাতে বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছতা ও আস্থা পায়। এজন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি বিনিয়োগ নীতি অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।’
ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পারারির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় প্রতিবেদনটির সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যবহারিক পথনকশা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিডার নির্বাহী সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) মো. হুমায়ূন কবীরের সভাপতিত্বে এ আলোচনায় অংশ নেন বিডার সাবেক মহাপরিচালক মো. আরিফুল হক, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিলড) সিইও ফেরদৌস আরা বেগম এবং বাণিজ্য নীতি ও সহজীকরণ বিশেষজ্ঞ মো. হাফিজুর রহমান।
এ সময় মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন শুধু বিদেশী নয়, দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই উভয় ধরনের বিনিয়োগকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, সমন্বিত ও সময়োপযোগী বিনিয়োগ আইন প্রণয়ন করা জরুরি।’
তিনি আরো বলেন, ‘১৯৮০ সালের বিদেশী বিনিয়োগ আইন এখন আর বর্তমান ও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। বর্তমান অবস্থায় এখানে খণ্ড খণ্ড সংস্কার যথেষ্ট নয়; বরং একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা প্রয়োজন।’










