সেখানে উপস্থিত ছিলেন হাজারো সফটওয়্যার ডেভেলপার, গেমার ও প্রযুক্তি অনুরাগী। তারা নতুন গ্রাফিকস প্রযুক্তি দেখার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সেদিনের একটি প্রদর্শনী পরবর্তী দুই দশকের প্রযুক্তি বিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছিল।

মঞ্চে ছিলেন জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান মিথবাস্টার্সের দুই উপস্থাপক অ্যাডাম স্যাভেজ ও জেমি হাইনেম্যান। তারা দুটি পেইন্টবল মেশিন ব্যবহার করে কম্পিউটারের দুটি ভিন্ন ধরনের প্রসেসিং পদ্ধতি প্রদর্শন করেন। প্রথম মেশিনটি একবারে একটি করে পেইন্টবল ছুড়ে ছবি আঁকছিল।

এরপর তারা দ্বিতীয় মেশিনটি উন্মোচন করেন। এতে একসঙ্গে ১ হাজার ১০০টি পেইন্টবল ছোড়ার ব্যবস্থা ছিল। কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই ক্যানভাসে ফুটে ওঠে মোনালিসার ছবি। দর্শকের কাছে এটি ছিল একটি আকর্ষণীয় প্রদর্শনী। কিন্তু বাস্তবে এনভিডিয়া দেখিয়েছে ‘প্যারালাল প্রসেসিং’ নামের একটি প্রযুক্তি, যা পরবর্তী সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি হয়ে ওঠে।

খাবারের টেবিলে জন্ম নেয়া এক ধারণা

এনভিডিয়ার যাত্রা শুরু ১৯৯৩ সালে। ক্যালিফোর্নিয়ার পূর্ব সান হোসের একটি ডেনিস রেস্তোরাঁয় বসে তিন প্রকৌশলী জেনসেন হুয়াং, ক্রিস মালাকোস্কি ও কার্টিস প্রিয়েম নতুন ধরনের একটি প্রসেসর তৈরির পরিকল্পনা করেন। তখন ব্যক্তিগত কম্পিউটারে থ্রিডি গেম জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রচলিত প্রসেসর দিয়ে উন্নত গ্রাফিকস তৈরি করা কঠিন ছিল।

তাদের ধারণা ছিল গ্রাফিকসের জন্য আলাদা বিশেষায়িত প্রসেসর প্রয়োজন। এ ধারণার ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় এনভিডিয়া।

কোম্পানিটি ১৯৯৯ সালে জিফোর্স ২৫৬ উন্মোচন করে। একে বিশ্বের প্রথম গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। প্রচলিত সিপিইউ একটির পর একটি কাজ সম্পন্ন করলেও জিপিইউ একই সময় হাজার হাজার গণনা করতে সক্ষম ছিল। ফলে ভিডিও গেমে উন্নত গ্রাফিকস ও বাস্তবসম্মত অভিজ্ঞতা সম্ভব হয়।

এআই গবেষণায় মোড় পরিবর্তন

গবেষকরা ২০১২ সালে এনভিডিয়ার জিপিইউ ব্যবহার করে অ্যালেক্সনেট নামে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রশিক্ষণ দেন। এ গবেষণা প্রমাণ করে, জিপিইউ শুধু গেমিংয়ের জন্য নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্যও অত্যন্ত কার্যকর। এটিই ছিল এআই গবেষণায় একটি বড় মোড় পরিবর্তনের ঘটনা।

এরপর ২০১৬ সালে এনভিডিয়া ডিজিএক্স-১ নামে এআই সুপারকম্পিউটার বাজারে আনে। এর মূল্য ছিল প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ডলার। তবে তখন এত ব্যয়বহুল যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে।

ঠিক সে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল পান জেনসেন হুয়াং। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলোন গবেষণার জন্য একটি ডিজিএক্স-১ সিস্টেম চান। তিনি ওই সময় ওপেনএআই প্রতিষ্ঠায় যুক্ত ছিলেন। জেনসেন হুয়াং তখন নিজেই প্রথম ডিজিএক্স-১ কম্পিউটারটি গাড়িতে করে সান ফ্রান্সিসকোয় ওপেনএআইয়ের কার্যালয়ে পৌঁছে দেন। সে গবেষণা দলেই ছিলেন ইলিয়া সুতস্কেভার, যিনি পরে চ্যাটজিপিটির অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে পরিচিতি পান।

এআই বিশ্বের ভিত্তি নির্মাণ

চ্যাটজিপিটি ২০২২ সালে উন্মুক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। তবে এনভিডিয়া এর আগেই প্রায় দুই দশক ধরে এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং ডেভেলপার ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছিল।

বর্তমানে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনি, অ্যানথ্রোপিকের ক্লড ও মেটার লামাসহ প্রায় সব বড় এআই মডেল এনভিডিয়ার জিপিইউ ও সিইউডিএ প্লাটফর্ম ব্যবহার করে তৈরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এনভিডিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু চিপ নয়, বরং গত দুই দশকে গড়ে তোলা সফটওয়্যার, ডেভেলপার টুল, নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি ও পুরো ইকোসিস্টেম।

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি কোম্পানি

করপোরেট ইতিহাসের প্রথম কোম্পানি হিসেবে গত অক্টোবরে এনভিডিয়ার বাজারমূল্য পৌঁছেছে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও জনপ্রিয়তায় বড় ভূমিকা রাখার কারণে কোম্পানিটি দ্রুত শীর্ষ চিপ নির্মাতায় পরিণত হয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, এনভিডিয়া কি দীর্ঘদিন এ অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কিনা।

এরই মধ্যে এএমডি, ইন্টেল, গুগল, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফট নিজেদের এআই চিপ বিকাশে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি গ্রোক ও সেরিব্রাসের মতো নতুন প্রতিষ্ঠানও বিশেষায়িত এআই হার্ডওয়্যার তৈরি করছে। ওপেনএআইও নিজস্ব এআই চিপ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে।

তবু অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আগামী কয়েক বছরেও এনভিডিয়ার গড়ে তোলা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সমকক্ষ বিকল্প তৈরি করা সহজ হবে না।

ভিডিও গেমের জন্য উন্নত গ্রাফিকস তৈরির লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া একটি কোম্পানি আজ এআই অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। এ যাত্রাই এনভিডিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। —ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে