হিসাববিজ্ঞানে ইতালীয় গণিতবিদ ও ধর্মযাজক লুকা প্যাসিওলির অবদান স্মরণ করে প্রতি বছরের মতো এবারো ১০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক হিসাববিজ্ঞান দিবস পালিত হচ্ছে। লুকা প্যাসিওলি বিখ্যাত হয়েছেন মূলত ১৪৯৪ সালে তার প্রকাশিত বইয়ে হিসাবরক্ষণের দুই তরফা দাখিলা পদ্ধতির বিবরণ প্রকাশের মাধ্যমে। দুই তরফা দাখিলা পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিটি আর্থিক লেনদেনকে দুই দিকে (হিসাববিজ্ঞানের পরিভাষায় ডেবিট ও ক্রেডিটে) সমভাবে লিপিবদ্ধ করতে হয়। যার ফলে আমরা মোট সম্পদের বিপরীতে মোট দায় ও মালিকানা স্বত্ব সম্পর্কে একটি ধারণা পাই। হিসাববিজ্ঞানকে সাধারণ অর্থে ব্যবসায়ের ভাষা বলা হয়। প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি মুনাফাভোগী-অমুনাফাভোগী, সরকারি-বেসরকারি, ট্রাস্ট, এনজিও, জয়েন্ট ভেঞ্চার ইত্যাদি যেমনই হোক না কেন সেটির অন্তর্নিহিত ভাব তথা আর্থিক অবস্থা, কার্যফল, নগদ প্রবাহ, মালিকানা স্বত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে জানার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে হিসাববিজ্ঞানের নীতি অনুযায়ী আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করতে হয়।
আর্থিক বিবরণী একদিকে যেমন একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত আর্থিক লেনদেনের পূর্ণরূপ প্রকাশ করার মাধ্যমে হিসাবের স্বচ্ছতা আনয়নে সহায়তা করে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জোগান দেয়। তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে কারিগরি দিক থেকে হিসাববিজ্ঞান বলতে দুই তরফা দাখিলা পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের কৌশলগত সীমিত পরিসরকে বোঝালেও দর্শনগত দিক থেকে হিসাববিজ্ঞানের পরিধি আরো ব্যাপক ও অর্থবহ। প্রতিষ্ঠানের সীমিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হিসাববিজ্ঞানের ভূমিকা বুঝতে হলে আমাদের সেই বড় পরিসরকে সামনে রাখতে হবে। বিষয়টিকে আমরা এভাবে বলতে পারি যে হিসাববিজ্ঞান বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং যেকোনো দেশের সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, সংস্কৃতির প্রচ্ছন্ন প্রভাব সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাববিজ্ঞান চর্চায় দেখতে পাওয়ার কথা। তাই বাংলাদেশের হিসাববিজ্ঞানের স্বরূপ বুঝতে হলে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাজনীতি ইত্যাদি মাথায় রাখতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ কেবলই একটি স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেল! বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণে তিন মাস ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং চলছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় নানামুখী সংস্কারের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সঠিক হিসাবের মাধ্যমে বিগত দিনে সংঘটিত অনাচার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল উৎস খুঁজে বের করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ভবিষ্যতে নিয়মাচারবহির্ভূত উপায়ে কোনো কিছু করার পথ চিরতরে বন্ধ করা। আর এক্ষেত্রে হিসাববিজ্ঞান ও হিসাববিদদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
এক্ষেত্রে আর্থিক খাতের বিশেষ করে ব্যাংক খাতের উদাহরণটি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। ২০১৪ সালের পর থেকে আমরা ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম প্রত্যক্ষ করি, যা পরবর্তী বছরগুলোয় ভয়াবহ আকার ধারণ করে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ থেকে শুরু করে ক্ষমতাশালীদের ছত্রছায়ায় ব্যাংকের দখল সবই হয়েছে এ সময়ে। একটি বিশেষ শিল্প গোষ্ঠী এমনই বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল যে অনিয়মই যেন তাদের জন্যে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাঁচটি তালিকাভুক্ত এবং একটি অতালিকাভুক্ত ব্যাংকের মালিকানা দখল করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বের করে নিয়েছে এ সময়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের নিয়মাচারবহির্ভূত বিষয় এবং তার প্রভাব কি আর্থিক প্রতিবেদনে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? উত্তর হচ্ছে না, হয়নি। কেন হয়নি? এর উত্তর পাওয়া যাবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জবাবদিহিতাহীন রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায়, যেখানে একক ব্যক্তির অঙ্গুলি হেলনে সবকিছু পরিচালিত হয়েছে এবং ক্ষমতাশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট একদল ব্যবসায়ী দুর্নীতিগ্রস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সুবিধা নিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। হিসাবের অস্বচ্ছতার ক্ষেত্রেও এরূপ ক্লেপটোক্রেসি দায়ী। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেশকিছু ব্যাংকে পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে। তার ফলে এরই মধ্যে সঠিক হিসাব বের হওয়া শুরু হয়েছে। জুন ২০২৪ প্রান্তিকে যেখানে সমস্যাপীড়িত ব্যাংকগুলো আর্থিক বিবরণীতে লাভ দেখিয়েছিল এবং অল্প পরিমাণে শ্রেণীকৃত ঋণ হিসাবভুক্ত করেছিল, সেখানে জুলাই বিপ্লবোত্তর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে সেপ্টেম্বর ২০২৪ প্রান্তিকে একই ব্যাংক ক্ষতি দেখাচ্ছে এবং অধিক পরিমাণে ঋণ হিসাবভুক্ত করছে। এ থেকে একটা বিষয় প্রতীয়মান হয় যে রাষ্ট্র অন্যায় প্রভাব বিস্তার না করলে, প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারলে আর্থিক প্রতিবেদনে সঠিক ও স্বচ্ছ হিসাব আসতে বাধ্য।
আর এক্ষেত্রে হিসাববিদরাও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন। একজন সনদধারী হিসাববিদ প্রতিষ্ঠানের একজন হিসাব ব্যবস্থাপক হিসেবে যেমন আর্থিক লেনদেনের সঠিক ফলাফল প্রকাশ করতে সহায়তা করে থাকেন, তেমনি নিরীক্ষক হিসেবে সঠিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে ব্যবস্থাপকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতেও ভূমিকা রেখে থাকেন। তবে পেশাদার হিসাববিদদের মধ্যে যে অন্যায় অনাচারের সহযোগী এবং আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা নেয়ার পথ বাতলে দেয়ার কাণ্ডারি নেই এমনটি নয়! তাই তো সনদধারী হিসাববিদদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বাংলাদেশে পেশাদার হিসাববিদদের দুটি সংগঠন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস (আইসিএবি) এবং ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্টসকেও (আইসিএমএবি) এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। বিশেষ করে সনদধারী হিসাববিদরা যাতে পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে তাদের কাজকর্ম করে থাকেন এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশে হিসাববিজ্ঞানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) ও সময়ে সময়ে বিভিন্ন মানদণ্ডে পেশাদার হিসাববিদদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে পারে।
সব অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা দেশে একটি সুস্থ ধারার হিসাববিজ্ঞান চর্চার ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারব, যা জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যয়কে ধারণ করে দেশমাতৃকার বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আর এটাই হোক এবারের আন্তর্জাতিক হিসাববিজ্ঞান দিবসে আমাদের সবার চাওয়া।
ড. মো. সাইফুল আলম: এফসিএমএ
সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










