ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কমে এসেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য এমন বাস্তবতা ধারাবাহিকভাবে আরো প্রকট হচ্ছে। এমনিতেই ঘনবসতির চাপে জর্জরিত রাজধানী ঢাকা। দিনে দিনে তিলোত্তমা এ নগরী বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। যে কারণে জ্যাম এখন রাজধানীবাসীর জীবনে নিত্যসঙ্গী। এতে অপচয় হচ্ছে সময়, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর ঢাকা। ১৫২টি দেশের ১ হাজার ২০০টিরও বেশি শহরের মোটরযানের গড় গতি নিয়ে করা এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (এনবিইআর)। ধীরগতির শহরের তালিকায় শীর্ষ ২০-এ ঢাকা শহরের পাশাপাশি ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামও রয়েছে। বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির শহরের তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের শহর ফ্লিন্ট। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গতির ১০০ শহরের মধ্যে ৮৬টিই যুক্তরাষ্ট্রের। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে সবচেয়ে দ্রুতগতির যে ২০টি শহরের নাম এসেছে, তার মধ্যে ১৯টি যুক্তরাষ্ট্রের। একটি কানাডার অন্টারিও অঙ্গরাজ্যের উইন্ডসর।
গবেষণার তথ্য অনুসারে, একটি শহরে যান চলাচলের গতি আংশিকভাবে সেখানকার যানজটের ওপর নির্ভর করে। বাকি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো—রাস্তার বিন্যাস, সড়কের গুণমান এবং পাহাড় ও নদীর মতো প্রাকৃতিক বাধা থাকা। এগুলোর ওপরই নির্ভর করে সড়কে যানবাহন কতটা দ্রুত চালানো যাবে।
এনবিইআরের গবেষণার বরাত দিয়ে মার্কিন সাময়িকী টাইম জানিয়েছে, গুগল ম্যাপ অনুযায়ী, ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গুলশান-২-এর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পার্ক পর্যন্ত নয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ৫৫ মিনিট এবং বিশ্বের দ্রুততম শহর মিশিগানের ফ্লিন্টে বিমানবন্দর থেকে স্লোয়ান মিউজিয়াম অব ডিসকভারি পর্যন্ত একই দূরত্বে যেতে সময় লাগে প্রায় ৯ মিনিট।
তবে ফিনল্যান্ডের আলটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক প্রত্যয় আকবরের মতে, বিষয়টি এমন নয় যে সবচেয়ে ধীরগতির শহর বেশি ঘনবসতিপূর্ণ কিংবা বেশি ঘনবসতিপূর্ণ শহরই সবচেয়ে বেশি ধীরগতির। মূলত যানবাহনের ব্যবস্থাপনার বিষয়টিই মুখ্য বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যানজট যখন থাকে না, তখনো ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি বিশ্বের অন্য শহরগুলোর চেয়ে কম। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এ শহরের সড়কগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও কমে এসেছে। তবে যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব বলে তারা দাবি করছেন।
এজন্য ঢাকার সড়কগুলোর যে সক্ষমতা তা বিবেচনায় নিয়ে চলাচলের জন্য যানবাহনের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি কমিয়ে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এতে কিছুটা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যানজটমুখর রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ৫৩০টি নতুন যানবাহনকে লাইসেন্স দিচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে কী পরিমাণ সড়ক রয়েছে, এমনকি রাজধানীর সড়কের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে সড়কের ব্যবস্থাপনা এবং যানবাহনের ব্যবস্থাপনা নির্ণয় করা খুব জরুরি। এ দুটি বিষয় সমন্বয় করতে না পারলে যানজট হ্রাস করা সম্ভব নয় বলে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বস্তুত ঢাকা শহরে কী পরিমাণ যানবাহনের ক্যাপাসিটি রয়েছে, এ নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। ক্যাপাসিটির বাইরে যানবাহন যেন রেজিস্ট্রেশন পেতে না পারে তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। যদি তা না হয়, তাহলে ঢাকা শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
তাছাড়া রাজধানীতে যে পরিমাণ গণপরিবহনের রেজিস্ট্রেশন দেয়া হচ্ছে, তার থেকে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চলাচলরত গাড়ির সংখ্যা বেশি। সড়কের ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত গাড়ি চলাচল করলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া অপ্রতুল গণপরিবহনের ফলে যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানোর মতো বিশৃঙ্খলাও নিত্যদিনের চিত্র। অন্যদিকে সড়কে যানবাহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না থাকায় দুর্ঘটনাও কমানো যাচ্ছে না। তাছাড়া সড়ক-মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল করছে, এমনকি যত্রতত্র রাস্তা পারাপারের ঘটনাও দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।
এভাবে বিরাজমান মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতিতে পুরো ঢাকা শহরের পরিবহন ব্যবস্থা আটকে আছে। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার বদলে স্বল্প মেয়াদে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ। শহরের জ্যাম কমাতে একাধিক বড় প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। বস্তুত ঢাকার ওপর চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। এছাড়া শহরে ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা ও মোটরসাইকেল কমানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মনোযোগের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে কারণে যানজট কমাতে বিপুল ব্যয়ে প্রকল্প নির্মাণ হলেও সমস্যা দূরীভূত হচ্ছে না।
আধুনিক নগর ব্যবস্থায় মানুষ শহরে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে চায়। এজন্য শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আলোচ্য গবেষণায়ই দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোর শহরে গাড়িতে চলাচল দরিদ্র দেশগুলোর তুলনায় ৫০ শতাংশের মতো দ্রুত হয়। এটা সম্ভব হয় ধনী দেশের শহরগুলোয় বড় বড় রাস্তা এবং অনেক ফাঁকা জায়গা থাকার কারণে। ফলে রাস্তায় বেশি গাড়ি নেমেও যানজট ছাড়া চলতে পারে। যেটি ঢাকা শহরে সম্ভব হয় না।
আমরা প্রত্যাশা করব, নগরবাসীর ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হবে। এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, সেটিই সবার কাম্য।










