নিয়মিত ভ্রমণসহ ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে যাতায়াতের জন্য মানুষের প্রধান পছন্দ রেলপথ হলেও প্রতি বছরই বাংলাদেশ রেলওয়েকে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়। রেলভ্রমণে টিকিট পেতে যাত্রীদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। এর পরও বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনে আসছে ব্রিটিশ আমলে চালু দেশের জনপ্রিয় এ গণপরিবহন ব্যবস্থা। রেলসেবা উন্নত করতে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও সংকট তেমন কাটেনি। বরং হাতে থাকা একাধিক মেগা প্রকল্প শেষ না হতেই নতুন প্রস্তাব নিয়ে হাজির হচ্ছেন রেলওয়ের কর্তাব্যক্তিরা। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে দুটি অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্প চলমান। এর একটি পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, যার আওতায় নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ। অন্যদিকে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। রেলপথ দুটির কোনোটিই এখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যেতে পারেনি। তাছাড়া প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন করে আরেকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ভাঙ্গা থেকে বরিশাল ও পায়রা বন্দর হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪১ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা।

জানা গেছে, মেগা প্রকল্পটির ওপর একটি প্রাক-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত দীর্ঘ ২১৫ কিলোমিটার নতুন রেলপথসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর নির্মাণকাল ধরা হয়েছে ২০২২-২৯ সাল পর্যন্ত। পিডিপিপিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যা ব্যয় হবে তার ৩২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা নেয়া হবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে ঋণ হিসেবে। বাকি ৯ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহের প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈদেশিক সহায়তার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিএইচইসি) এবং চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশনের (সিআরডিসি) নাম উল্লেখ করা হয়েছে পিডিপিপিতে। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে চলমান সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হলো ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ’। এটি নির্মাণে সরকারের খরচ হচ্ছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৬৭ কোটি ডলার বা ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে এক্সিম ব্যাংক অব চায়না। প্রিফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিটের (পিবিসি) মাধ্যমে নেয়া এ ঋণের সুদহার ২ শতাংশ। গ্রেস পিরিয়ড ছয় বছর। রিপেমেন্ট পিরিয়ড ২০ বছর। ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে ২০২৫ সাল থেকে। সুদসহ প্রতি বছর গড়ে সাড়ে ১৩ কোটি ডলার বা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এদিকে রেলপথটির ঢাকা-ভাঙ্গা অংশ আগামী ১০ অক্টোবর উদ্বোধনের কথা রয়েছে। যদিও পুরো প্রকল্পটি শেষ করতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় চেয়েছে রেলওয়ে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে তৈরি ১৭০ কিলোমিটার রেলপথে ট্রেন পরিচালনা করে সরকারের যে পরিমাণ অর্থ আয় হবে, প্রকল্পটির জন্য গ্রহণ করা ঋণের কিস্তির তুলনায় তা নগণ্য। এর ফলে বাড়বে ঋণ-জিডিপির অনুপাত, যা এক সময় বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা বলছেন, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার পর রেলপথটি ‘আন্ডার ইউটিলাইজড’ থাকার একটা সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ রেলপথটি খুব বেশি ব্যবহৃত হবে না বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। 

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৮ হাজার কোটি টাকায় বাস্তবায়নাধীন চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মাণাধীন রেলপথটি আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তবে এ রেলপথের অর্থনৈতিক সুফল নিয়েও শঙ্কার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর রেলের উন্নয়নে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এ সময়ে রেলের সেবার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। ট্রেন চলছে আগের চেয়ে কম। রেলের লোকসানের বোঝাও ভারী। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেল লোকসান দিয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটি লোকসান গুনেছে রেকর্ড ২ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। রেলের উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়ার অংশ হিসেবে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করেছিল সরকার। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, নতুন ট্রেন চালুসহ সারা দেশকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে নেয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনা। বেশকিছু বড় প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে এত কিছুর পরও ধুঁকে চলছে রেল। বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি লোকসানের পাল্লাও ভারী হচ্ছে সংস্থাটির। লোকসানের ক্ষতি পোষাতে এক দশকে দুই দফা রেলের ভাড়াও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর পরও প্রতি বছর বড় অংকের লোকসান গুনে চলেছে সংস্থাটি। এতে মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পরবর্তী এক দশকে রেলের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। 

রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০১১-১২ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত রেলের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৪৫২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার বছর (২০১১-১২ অর্থবছর) রেলের উন্নয়ন বাজেট ছিল মাত্র ১ হাজার ৯০৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অথচ চলতি (২০২১-২২) অর্থবছর সংস্থাটিকে উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক দশকে উন্নয়ন বাজেট বেড়ে প্রায় সাড়ে ছয় গুণ হয়েছে। এদিকে গত ১০ বছরে রেলের আয় হয় ১০ হাজার ৫৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা। একই সময় রেলের পরিচালন ব্যয় ছিল ২৩ হাজার ৫৭৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দশকে রেলের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৪ কোটি ৭ লাখ টাকা।

লোকসান ও বড় অংকের প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে চলমান মেগা প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনীতিতে কতটা অবদান রাখতে সক্ষম হবে তা বাস্তবায়নের পর যথাযথ যাচাই-বাছাই করে নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। এমনিতেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিম্নগামী। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি কিংবা রিজার্ভ হ্রাসের পেছনেও এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্পের দায় আছে। সরকারের কৃচ্ছ্র নীতির ঘোষণার মধ্যে বড় অংকের অর্থ ব্যয়ের এ পরিকল্পনা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়লে ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লে তখন এ নিয়ে পরিকল্পনা এগোনো যায়। এছাড়া বিদ্যমান দুই প্রকল্প কতটুকু সাফল্য দেখায় তা পর্যবেক্ষণও জরুরি।