বছর দেড়েক ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ সংকট। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়লেও অনেক দেশ তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৩ সাল জুড়ে দেশের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মাথাব্যথার কারণ ছিল মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হওয়া এবং রিজার্ভ থেকে সরকারের ডলার বিক্রির কারণে গত বছর রিজার্ভ কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। দীর্ঘদিন ডলারের বিনিময় হার ৮০-৮২ টাকা ধরে রেখেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছর বিনিময় হার বাজারের ওপর কিছুটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এতে বাজারে একাধিক বিনিময় হার দেখা যায়। দেখা গেছে, সরকার নির্ধারণ করে দিচ্ছে এক রেট, খোলা বাজারে বিনিময় হচ্ছে অন্য রেটে। এতে আমদানি কিছুটা কমলেও রফতানি ও রেমিট্যান্স আয়ের সুবিধা কতটুকু ঘরে তুলতে পেরেছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
সরকারি উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, দেশের রফতানি আয়ের একটি বড় অংশই বিভিন্নভাবে বিদেশে থেকে যাচ্ছে বা আনুষ্ঠানিকভাবে আসছে না। অনেকেই এখানে বড় আকারের অর্থ পাচারের আশঙ্কা করছেন। এদিকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স আকর্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া হলেও এতে সাফল্য আশাব্যঞ্জক নয়। ব্যাংকের চেয়ে ডলারের বিনিময় মূল্য বেশি পাওয়ায় হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলেই টাকা পাঠাচ্ছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক। বাংলাদেশ এ কারণে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা রিজার্ভে প্রভাব ফেলছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত বছর ব্যাংক ঋণ হার বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। এর মধ্যে নতুন বছরে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আরেক দফা সুদহার বৃদ্ধির পথে যাবে এমনটা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু আর্থিক খাতসহ বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না এনে স্রেফ সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে চলতি জানুয়ারিতে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার উঠেছে ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে ঋণের সুদহার বাড়ানো হয়েছিল। যদিও সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে দেখা যায়নি। মূল্যস্ফীতির এ বাড়বাড়ন্ত পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৭ জানুয়ারি আগামী ছয় মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। এরই মধ্যে মুদ্রানীতির মৌলিক কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। শনিবার গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে মুদ্রানীতি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রায় দুই বছর ধরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। আর অর্থনীতির ভিতকে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল করছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমাগত ক্ষয়। শ্লথ হয়ে এসেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দুই প্রধান উৎস রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও। এতে প্রায় দুই বছর ধরে চলে আসা ডলার সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। আমদানি এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমিয়েও ডলার সংকট কাটাতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে তীব্র হয়ে উঠেছে তারল্য বা নগদ টাকার সংকট। স্থবিরতা চলছে বেসরকারি বিনিয়োগেও। দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ বাড়ছে সরকারের। বিপরীতে কমছে রাজস্ব আহরণ। অর্থ সংকটে পড়ে বিদ্যুৎ, সারসহ বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি ও প্রণোদনার অর্থও পরিশোধ করতে পারছে না সরকার। বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে ভর্তুকির দায় পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে সরকারের তরফে। স্থবিরতা চলছে দেশের পুঁজিবাজারেও। অর্থনীতির নানামুখী সংকটের মধ্যেই চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশে না কমলেও ২০২৩ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। আর বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এ সময় খাদ্যশস্যের দামও কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যয়ও এ সময় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে এর কোনোটিরই ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। পণ্যের দাম না কমে উল্টো গত এক বছরে দেশে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। গত বছরজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল ছিল দেশের মানুষ। বছর শুরুর মাস তথা জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর নভেম্বরে এসে তা দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশে। মাঝে অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার সরকার প্রকাশিত এ পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি। বাজার ও আর্থিক খাতে সুব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং কথিত সিন্ডিকেটের আধিপত্যে মূল্যস্ফীতি বেসামাল বলে মনে করছেন তারা।
কেবল সুদহার বাড়িয়ে-কমিয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ অর্থনৈতিক অন্য সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে হলে সুশাসন ও সংস্কার এবং বিশেষ করে ব্যাংক খাতের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর সুপারভিশন দরকার বলে মনে করেন তারা। কার্যকর বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতিশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি জরুরি। আমাদের অর্থনীতির আকারের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজার বিকাশেও জোর দেয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ বাড়াতে হবে। বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মুদ্রানীতিতে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা না থাকলে সেটি প্রণয়ন কিংবা ঘোষণা দিয়ে কোনো লাভ নেই।
ডলার সংকট কাটাতে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বৃদ্ধিতে জোর দেয়া দরকার। বিশেষ করে অবৈধ হুন্ডির তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। কেবল তৈরি পোশাক খাতকে তোষণ না করে প্লাস্টিক, চামড়া, পাটসহ অন্যান্য পণ্যে মনোযোগ দেয়া উচিত। এর মাধ্যমে আমাদের রফতানি আয়ে বৈচিত্র্য আসবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনা করলে বৈদেশিক বিনিয়োগ নেহাত নগণ্য। কার্যকর আইনের শাসন ও সময়োপযোগী রীতিনীতি ছাড়া বিদেশীরা বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবে না। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে জোর দিতে হবে।
বস্তুত উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটগুলোর মূলে অব্যবস্থাপনা, অর্থ পাচার, দুর্নীতি, সুশাসনের ঘাটতিসহ নানা কারণ রয়েছে। এ কারণে শুধু নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অর্থনীতির সংকট কাটাতে মূল্যস্ফীতিসহ দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা দাবি করছেন। তাছাড়া নীতি সুদহার বাড়ানোয় ব্যাংকগুলো এখন ঋণের সুদহার বাড়াবে। ফলে অর্থ সরবরাহ আরো সংকুচিত হয়ে যাবে। এতে ব্যাংকগুলো ঋণপ্রবাহ আরো কমাবে। উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান কমার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ভূমিকাকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়া উচিত।
দেশের নীতিনির্ধারকরা এখানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনা মহামারীসহ সব বৈশ্বিক সংকটের দোহাই দেন। সম্প্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট। দেশের বেশির ভাগ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল। বাজেট কমিয়ে, সঞ্চয় ভাঙিয়ে কায়দা করে বেঁচে আছে তারা। দেড় বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি নীতিনির্ধারকদের। কেবল ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ানোর মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সেটা যে তেমন সাফল্য আনতে পারেনি মূল্যস্ফীতির লাগামহীন অবস্থাতেই স্পষ্ট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির অন্তত ৫০ শতাংশ এখনো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ কারণে উন্নত দেশগুলোর মতো সুদহার বাড়িয়ে এখানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার পুরোপুরি সিন্ডিকেট-নির্ভর। দু-চারজন ব্যবসায়ী চাইলেই কারসাজির মাধ্যমে এখানে পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন। আবার ঘুস-দুর্নীতির ভয়াবহতার কারণে বাজারে কালো টাকার দৌরাত্ম্যও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এ কারণে সুদহার বাড়িয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয় কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে।
ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকার মতো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে যখন মূল্যস্ফীতি বেশি ছিল, তখন তারা তাদের সুদের হার বেঁধে রাখেনি। তারা আরো বিচক্ষণতার সঙ্গে মুদ্রানীতি ব্যবহার করেছে এবং সুদের হার বাড়িয়ে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা যদি প্রকৃত অর্থেই মূল্যস্ফীতি বাগে আনতে চান তাহলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।










