বাংলাদেশের মানচিত্রে চোখ বুলালে দেখা যায়, শিরা-উপশিরায় বয়ে যাচ্ছে অসংখ্য নীল জলরেখা। প্রাচীন সভ্যতার মতো এ দেশের নদীতীরে গড়ে ওঠে নগর ও শহর। আনুমানিক ৪০০ বছর আগে রাজধানী ঢাকার গোড়াপত্তন হয় বুড়িগঙ্গার কোলঘেঁষে। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যে ভরা বুড়িগঙ্গা এখন মরা নদী হিসেবে পরিচিত। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, ঢাকার অধিকাংশ নদী-খাল এখন মৃতপ্রায়। আর সময়ের স্রোতে না হারিয়ে যেসব খাল-নদীর স্রোত এখনো প্রবাহমান, তাদের বুকজুড়ে আছে বিষাক্ত বর্জ্য। সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার হলো, যে হাসপাতালে মানুষ যায় রোগমুক্তি লাভে, সে হাসপাতালের তরল বর্জ্য দূষিত করছে আমাদের অবশিষ্ট পানির উৎস। হাসপাতালগুলোর নেই সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সরঞ্জাম ও চর্চা। কর্মী নিয়োগে চলে ঘুসের আদান-প্রদান। মান্ধাতার আমলের সরঞ্জাম, অদক্ষ কর্মী এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালার অনুসরণ না করায় হাসপাতালের বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদী-খালে। ফলে জলাশয় দূষিত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি সন্নিকটে বসবাসরত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। উদ্ভূত এ অবস্থার শিগগিরই সমাধান না করা গেলে বিষাক্ত বর্জ্যবাহিত রোগ দানা বাঁধবে মানুষের শরীরে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ঢাকা জেলার নদ-নদী, খাল-বিল দূষণকারীদের তালিকা চাওয়া হয় ২০২১ সালের নভেম্বরে। এক মাস পর পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার খাল ও নদ-নদী দূষণকারীদের তালিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে প্রাথমিকভাবে দূষণের ২৮০টি উৎস চিহ্নিত করা হয়। সেখানে দেখা যায়, শিল্প বর্জ্যের পাশাপাশি রাজধানীর হাসপাতালের তরল বর্জ্যও দূষণের একটি বড় উৎস। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ২৮০টি উৎসের মধ্যে ২২০টিই ছিল হাসপাতাল।
রাজধানীর হাসপাতালগুলোর তরল বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী, তুরাগ নদ, বালু নদ, রামপুরা খাল, কল্যাণপুর খাল, বেগুনবাড়ী খাল, ভাটারা খাল, হাজারীবাগ খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, বাড্ডা খাল, আদি বুড়িগঙ্গা ও রূপনগর খাল। দূষণকারী হাসপাতালের মধ্যে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এসপিআরসি জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মহানগর হাসপাতাল, ঢাকা মহানগর শিশু হাসপাতাল, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, তাকওয়া স্পেশালাইজড হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল, মেডিলাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেহাল দশার মূল কারণ অনুন্নত সরঞ্জামাদি ও অদক্ষ বর্জ্য নিষ্কাশন কর্মী। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি যথাযথ পালন না করায় এ দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বহু হাসপাতালে বর্জ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই, এমনকি বহু হাসপাতালে নেই বর্জ্য শোধনাগার। এসব বর্জ্য হাসপাতালের পাশে বসবাসরত নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে পর্যাপ্ত কর্মী নেই। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ৪০ শতাংশের বেশি বর্জ্য কর্মীর প্রশিক্ষণ নেই; ৬০ শতাংশের বেশি বর্জ্য কর্মী নিজের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ বহু তথ্য জানেন না।
এ অবস্থার উন্নতি না হলে হাসপাতালের বর্জ্য পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে পরিণত হবে। কেননা এসব বর্জ্য কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই সুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে সরাসরি নদী ও খালে মিশছে। তা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তবে বর্জ্য সুয়ারেজ লাইনের মধ্য দিয়ে অপসারণের আগে পরিশোধনের নিয়ম থাকলেও দেশের কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই মানছে না। হাসপাতালের উদ্যোগেই ওয়েস্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ডব্লিউটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ হাসপাতালই তা মানছে না। এতে সৃষ্টি হচ্ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি। চিকিৎসা বর্জ্যে বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থ থাকে। পরিশোধন ছাড়া সেগুলো সরাসরি নিষ্কাশনের ফলে নতুন নতুন ক্ষতিকারক অণুজীব সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ওইসব রাসায়নিক পদার্থ মানুষের দেহে প্রবেশের পর দীর্ঘমেয়াদে জেনেটিক্যাল পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাতে বিকলাঙ্গ মানবশিশুও জন্ম নিতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, এরই মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় ৫২ লাখ মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে, তাদের মধ্যে ৪০ লাখই শিশু। এ অবস্থা বেগতিক হলে অদূর ভবিষ্যতে চিকিৎসা খাতের প্রতি পুরোপুরি আস্থা হারাবে মানুষ। বর্তমানে এমনিতেও দেশের নাগরিকদের চিকিৎসা নেয়ার পছন্দনীয় দেশগুলো হলো ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড।
বর্জ্য নদী-খালে গিয়ে যেমন স্বাস্থ্য বিপর্যয় হবে তেমনি দেশের আর্থিক উন্নতির জন্য তা হবে হুমকিস্বরূপ। এ দূষণের কারণে জীবিকা অর্জনে নদী ও মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল বৃহৎ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যের রোষানলে পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের জিডিপিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসা বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়। স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দিলে এ খাতে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা কঠিন হবে। পাশাপাশি বর্জ্য কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বর্জ্য কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।
‘মেডিকেল বর্জ্য বিধি ২০০৮’-এ উল্লেখ রয়েছে, চিকিৎসা বর্জ্যগুলো উৎসেই পৃথককরণ, পরিবহনের জন্য চিকিৎসা বর্জ্য প্যাকেটের ওপর প্রতীক ব্যবহার, উপযুক্ত দহনযন্ত্র ব্যবহার, পচনশীল দ্রব্য মাটিতে পুঁতে ফেলাসহ বর্জ্য ফেলার জন্য বিভিন্ন রঙের পাত্র ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া ওই নীতিমালায় হাসপাতাল বর্জ্য পৃথককরণের জন্য পাত্রের বৈশিষ্ট্য, যন্ত্র চালানোর জন্য মান, নির্গমন ও নিঃসরণ মান সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু বর্তমান চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। উপযুক্ত তত্ত্বাবধান ও মনিটরিংয়ের অভাবে হাসপাতালগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে। অনেক বর্জ্য কর্মী ব্যবহৃত জিনিসপত্র ভাঙাড়ির কাছে বিক্রি করে দেন। এ রকম শিথিল ব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্য খাত বিতর্কিত হয়।
হাসপাতাল ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিকিৎসা বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্কাশন ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও হাসপাতালে বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং সুচিন্তিত ব্যবস্থাপনা থাকা অপরিহার্য। বিশেষত তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে বিশেষ ধরনের ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। মারাত্মক বর্জ্যকে দূষণমুক্ত করে সাধারণ ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্যান্য তরল বর্জ্যের সঙ্গে নিষ্কাশন করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে চিকিৎসা বর্জ্যের নিষ্কাশনের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত কিংবা মানসম্মত আধুনিক ব্যবস্থা চালু নেই। চিকিৎসা বর্জ্যের নিষ্কাশন সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যে ব্যবস্থাটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং ২০০৮ সালের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তার বাস্তবায়নও নেই। সুতরাং এ আইনকেও যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলো ভরাট হওয়ার পেছনেও বর্জ্য অব্যবস্থাপনা একটি বড় কারণ। উন্নত দেশগুলোয় বর্জ্য রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহারের নানা উদ্যোগ রয়েছে। জৈব সার থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যন্ত অনেক কিছুই করা হয় এসব বর্জ্য ব্যবহার করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নীতিনির্ধারকদের নতুন করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে এবং সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।










