প্রখ্যাত মার্কিন লেখিকা হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টো বলেছিলেন, ‘নারীরা সমাজের প্রকৃত স্থপতি’। তার উক্তির মতোই নারী আছেন মানবসভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে, আছেন সব কর্মকাণ্ডের পুরোভাগে, আছেন সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সব পরিসরেই সর্বত্র নারীরা তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। সেজন্যই একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে নারী উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে নারীদের রয়েছে অবারিত সুযোগ ও সম্ভাবনা। সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্ধেকটাই যখন নারীদের নিয়ে, তাই তাদের বাকি রেখে যেকোনো ক্ষেত্রে পূর্ণতা আনয়ন সম্ভব নয় এবং তাদের অংশগ্রহণ আনতে পারে অভাবনীয় পরিবর্তন। একইভাবে দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নেও তাদের অংশগ্রহণ অতীব প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ফলে বর্তমানে নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বৈশ্বিক নানা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৩’-এর সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১২ ধাপ এগিয়ে বর্তমানে ৫৯তম অবস্থানে রয়েছে। ওই সূচক অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলো—ভুটান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ১০৩, ১১৫, ১১৬, ১২৭ ও ১৪২তম অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ লিঙ্গসমতার সূচকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জন্য অনুসরণীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে উন্নত দেশ এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো অনেকটাই সীমিত। দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে মোট বিনিয়োগকারী বা বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭১। যার মধ্যে পুরুষ বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৬৪৬টি এবং নারী বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৪ লাখ ৩০ হাজার ২৫২। অর্থাৎ দেশের পুঁজিবাজারে মোট বিনিয়োগকারী আনুমানিক ২৫ শতাংশ নারী। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নানামুখী উদ্যোগের ফলে বর্তমানে পুঁজিবাজার ও সংশ্লিষ্ট খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমে বাড়ছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী ও উদ্যোক্তা হিসেবে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। বিনিয়োগকারী হিসেবে নারীরা তাদের বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজারে অবদান রাখেন। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীরা বর্তমানে তাদের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে সফল শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করছেন এবং সেসব ব্যবসার পরিধি এমনকি দেশের পুঁজিবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন। নানা বাধা সত্ত্বেও নারীরা অর্থনৈতিক কার্যকলাপে সফলতার সঙ্গে অবদান রাখছেন। এভাবে পুঁজিবাজারে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের পুঁজিবাজারের সামষ্টিক ব্যাপ্তি বাড়াতে ও বাজারের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী ও উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নারীদের যে ত্রিমুখী ভূমিকা রয়েছে তা হলো:
বিনিয়োগকারী হিসেবে পুঁজিবাজারে নারীর ভূমিকা: পুঁজিবাজার মূলত বিনিয়োগনির্ভর বাজার। আর্থিক খাতের এ বাজারের মূল উপজীব্য হলো বিনিয়োগ ও বিনিয়োগকারী। বিনিয়োগ মূলত আসে সঞ্চয় থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে দেশের মোট জাতীয় সঞ্চয় ২৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আমাদের সমাজ ও পরিবারে অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা রয়েছেন সঞ্চয়ের পুরোভাগে। নারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সঞ্চয় করে থাকেন, তাই তাদের বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ও সুফল বয়ে আনতে সক্ষম। এছাড়া বাস্তবিকভাবেই নারীরা অনেক মনোযোগী, পর্যবেক্ষণশীল ও পরিণামদর্শী হন বিধায় তারা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা রাখেন। আমাদের পরিবার ও সমাজের সর্বত্র কখনো মাতা, কখনো ভগিনি, কখনো বা বধূর ভূমিকায় নারীরা সফলভাবে দায়িত্বপালন করে চলেছেন। পরিবারের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে সবকিছু সামলে পরিবারকে এক সুতোয় বেঁধে রাখেন নারীরাই। গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনায় আমাদের সমাজের নারীদের অসাধারণ নৈপুণ্য তাদের ব্যবস্থাপক গুণেরই পরিচায়ক। তাই সঠিক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি অনুসরণে নারীরাও পুঁজিবাজারে সফল বিনিয়োগকারী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখেন। সর্বোপরি নারীরা ঠাণ্ডামাথায় সুচিন্তিত বিনিয়োগ করতে সিদ্ধহস্ত হবেন এমনটাই স্বাভাবিক।
পুঁজিবাজারে অনেক ঝুঁকি বিদ্যমান এমন ধারণা থেকেই নারীরা অনেক সময় এ খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন না। বাস্তবে পুঁজিবাজারে ঝুঁকি আছে ঠিক, তবে সেটা মূলত সেকেন্ডারি মার্কেটেই বেশি। ঝুঁকি ছাড়াও বাজারের অনেক পণ্য রয়েছে। বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং ভালো কোম্পানি ও ভালো ব্যাংকে বিনিয়োগে ঝুঁকি অনেকটাই কম। দেশের নারীদের সঞ্চয়কে বিনিয়োগে পরিণত করে মিউচুয়াল ফান্ড, ফিক্সড ইনকাম ইনস্ট্রুমেন্ট এবং ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে আনতে পারলে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট খাতের উন্নয়ন হবে। নারীরা যাতে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ, লেনদেনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে পারেন সেজন্য উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং লেনদেন সহজতর করতে অনলাইন ট্রেডিং প্লাটফর্ম এবং অ্যাপ তৈরি ও উন্নয়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ উদ্যোগ সফল করতে বিএসইসি অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছে যা শিগগিরই সফলতার মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়।
পুঁজিবাজারে নারীদের আরো উৎসাহিত করতে নারীদের জন্য বিশেষায়িত অরেঞ্জ বন্ড চালুর উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বিএসইসি। নারী বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যদি ঋণ প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে, এমনকি বাজার মধ্যস্থতাকারীরা অরেঞ্জ বন্ড ইস্যু করে তার অর্থায়ন করতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
বাজার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পুঁজিবাজারে নারীর ভূমিকা: পুঁজিবাজারের যাবতীয় ক্রিয়াকলাপে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বাজার মধ্যস্থতাকারীরা। বাজারের লেনদেন থেকে শুরু করে সবকিছুতেই তাই তাদের রয়েছে ভূমিকা রয়েছে। বাজার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ তাই নারী বিনিয়োগকারীদের উৎসাহী করতে কাজে আসবে বলে ধারণা করা যায়। বিএসইসির উদ্যোগে নারী-পুরুষ সমতা আনয়ন এবং লিঙ্গবৈষম্য হ্রাসের চেষ্টায় বাজার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নারী কর্মীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এর পরও ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংগঠনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় দেশের পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম, যা বাড়াতে বিএসইসির উদ্যোগে কার্যক্রম চলমান আছে। বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, বাংলাদেশ মাচেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশেন (বিএমবিএ) এবং ব্রোকারেজ হাউজগুলোয় নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যাও বেড়েছে। এ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নিশ্চিতে, নারীদের পুঁজিবাজারের প্রতি আরো আগ্রহী ও সচেতন করতে বিএসইসি অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে নিয়মিত নানা প্রোগ্রাম, সেমিনার, কর্মশালা ও অনুষ্ঠান করে আসছে। বাজার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ও খাতসংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোয় নারীর অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে এবং এ খাতে লিঙ্গসমতা নিশ্চিতকরণে এসব উদ্যোগ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।
উদ্যোক্তা হিসেবে পুঁজিবাজারে নারীর ভূমিকা
পুঁজিবাজার অর্থায়নের এক বিরাট সুযোগ। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দেশের উদ্যোক্তারা তাদের উদ্ভাবনী আইডিয়াকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতিষ্ঠিত নারী উদ্যোক্তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের অরেঞ্জ বন্ড ইস্যু করে তার অর্থায়ন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কমিশন দ্রুততার সঙ্গে বিষয়টি প্রক্রিয়াকরণ ও সর্বাত্মক সহায়তার চেষ্টা করবে। সর্বোপরি নারী উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে এবং তাদের উদ্যোগকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়া হবে। নারী উদ্যোক্তাদের তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধাজনক পুঁজির উৎস যেন খুঁজে পেতে পারেন তার জন্য পুঁজিবাজার ও সংশ্লিষ্ট খাতকে সেই অনুযায়ী সহায়কভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিএসইসির উদ্যোগে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নারীদের জন্য আয়োজিত কর্মসূচি, ওয়ার্কশপ, সম্মেলন ইত্যাদি বাংলাদেশের নারীদের পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের সফলতার সঙ্গে বিনিয়োগ পরিচালনায় জন্য যোগ্য ও বিচক্ষণ করে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতের জন্য দেশের নারীদের উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। নারীরা পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের সামর্থ্য ও সঞ্চয়ের সদ্ব্যবহার করে নিজেদের যেমন আর্থিকভাবে লাভবান ও সফল করবেন, একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারকেও শক্তিশালী করবেন। নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ পুঁজিবাজারের প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা যায়।
মোহাম্মদ রেজাউল করিম: নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)










