সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। এজন্য সারা দেশে আঞ্চলিক ও মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ অংশে ট্রমা সেন্টার (আহতদের চিকিৎসা কেন্দ্র) নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সারা দেশে এমন ২১টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে ট্রমা সেন্টার করা হয়েছে, তা পূরণ হয়নি। এমনকি এসব সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই চালু করা যায়নি।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, প্রায় দুই দশক আগে সড়কপথে দুর্ঘটনাকবলিত যাত্রীদের দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে দেশজুড়ে সড়ক ও মহাসড়কের পাশে ট্রমা সেন্টার নামে চিকিৎসালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। সেন্টারগুলোর উদ্বোধনও করা হয়। কিন্তু এত বছর পরও জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। ট্রমা সেন্টারগুলোয় চিকিৎসা সরঞ্জামও নেই। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এগুলো নির্মাণে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু নির্মাণের পর পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আলাদা করে আঞ্চলিকভাবে ট্রমা সেন্টার কার্যকর নয়। সেজন্য নতুন করে ট্রমা সেন্টার নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার।
বর্তমানে ব্যবহার না থাকায় ট্রমা সেন্টারের অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভবনের মালপত্র চুরি হয়েছে। কিছু ভবন খালি পড়ে থাকায় সেখানে মাদকের আসর বসাচ্ছে মাদকসেবীরা। মহাসড়কের পাশে ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করার উদ্দেশ্য ছিল, দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত আহতদের সেখানে নিয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসা দেয়া, যাতে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়। জানা গেছে, প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন পরামর্শক চিকিৎসক, তিনজন অর্থোপেডিকস সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট, দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক, ১০ জন নার্স, ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার, টেকনিশিয়ানসহ ৩৪টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সেন্টারেই পদ অনুযায়ী জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরঞ্জামও দেয়া হয়নি। ট্রমা সেন্টারগুলো পাবনার আটঘরিয়া, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও উল্লাপাড়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, গোপালগঞ্জ সদর, মাদারীপুরের শিবচর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, শরীয়তপুরের জাজিরা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা (মধুখালী), মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর, সাভারের ধামরাই, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, হাটহাজারী ও রাউজান, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ফেনীর মহীপাল, ময়মনসিংহের ভালুকা, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের বাহুবলে নির্মাণ করা হয়েছে।
এ সেন্টারগুলো কাজে না লাগায় জনগণের অর্থ ‘অপচয়’ হয়েছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। মূলত জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকায় ট্রমা সেন্টারের মতো প্রকল্প নেয়া হচ্ছিল। ট্রমা সেন্টারের ভবনগুলো খালি পড়ে থাকার বিষয়টি দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং তাতে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে সামনে এসেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে সড়কে প্রাণ গেছে ৭ হাজার ৭১৩ জনের। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভবন বা স্থাপনা নির্মাণে সরকারি সংস্থার আগ্রহ থাকে। কিন্তু সেই স্থাপনা বা ভবন ব্যবহার করে মানুষকে সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোগ থাকে না। নির্মাণে আগ্রহের কারণে সেখানে কেনাকাটা ও ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার বিপরীতে আর্থিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ থাকে। তবে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিবের মতে, ট্রমা সেন্টারের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যাবে না। অবশ্যই সেন্টারগুলো দরকার আছে। জনবল নিয়োগ ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা করে সেগুলো চালু করা সম্ভব। কিন্তু এত বছরেও যেহেতু কার্যক্রম শুরু করা যায়নি, তাই বর্তমানে নতুন করে ট্রমা সেন্টারগুলো চালু করার সম্ভাবনা কতটুকু রয়েছে তার যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ট্রমা সেন্টার ধারণাটি বাস্তবসম্মত নয়। পরিকল্পনাগত দুর্বলতার কারণে ট্রমা সেন্টারগুলো কাজে লাগানো যায়নি। ট্রমা সেন্টার চালানোর মতো জনবল নেই। যেহেতু নতুন করে আর ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হবে না। সে হিসেবে নির্মিত ভবনগুলো কীভাবে কাজে লাগানো হবে, এক্ষেত্রে নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সড়কের পাশে নির্মিত ট্রমা সেন্টার চালু হলে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমে আসতে এমনটিই মত দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে। কারণ আহত রোগীদের হাসপাতালে নেয়ার সময় রোগীর রক্তক্ষরণ ও গুরুতর রোগীদের অনেক সমস্যা হয়। অনেক সময় রোগী মারাও যায়। শহরের যানজট পেরিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে রোগীর জীবন বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়।
এখন ট্রমা সেন্টারগুলোর কার্যক্রম ধীরে ধীরে শুরু করা উচিত বলে জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন। তবে যথাযথ সমীক্ষা না করে প্রকল্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য ট্রমা সেন্টার একটি উদাহরণ হতে পারে। অবশ্য এ রকম উদাহরণ আমাদের দেশে নতুন নয়। কিন্তু এভাবে একের পর এক প্রকল্পের পেছনে অর্থ অপচয় দেশের জন্য কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না। তাই রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচের ক্ষেত্রে এখনই লাগাম টানা উচিত। আমরা প্রত্যাশা করব ট্রমা সেন্টারের মতো প্রকল্পের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন প্রকল্প গ্রহণ করবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে, এটিই আমাদের কাম্য। তার আগে বিদ্যমান ট্রমা সেন্টারগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেক্ষেত্রে সঠিক ও বাস্তবানুগ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।










