বিশ্ববাজারে সব ধরনের সারের দাম নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সার আমদানি হয়েছিল ৫৪ লাখ ৯ হাজার টন। এর মধ্যে প্রথম সাত মাস অর্থাৎ জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সার আমদানিতে মোট ব্যয় হয় ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে সার আনতে ১৮৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলার খরচ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সারের আমদানি ব্যয় কমেছে ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। যদিও গুরুত্বপূর্ণ এ কৃষি উপকরণ আগের দামেই কিনতে হচ্ছে কৃষকদের, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সারা দেশে বোরো মৌসুমের ধান চাষ চলছে। এটি চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসুম এবং এ মৌসুমের উৎপাদনের ওপর দেশে সারা বছরের চালের বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। এ সময়ে বিভিন্ন ধরনের সারের ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়া ভু্ট্টা, সবজিসহ মাঠে অন্য যেসব ফসল রয়েছে সেগুলোর পেছনেও কৃষকের খরচের চাপ বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কমে আসার পরেও দেশীয় বাজারে এ কৃষি উপকরণের দাম কমছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতিতে পড়বে। তাই বিশ্ববাজারের সঙ্গে কৃষি উপকরণটির দামের সমন্বয় করতে পদক্ষেপ কাম্য। 

বিশ্বমন্দায় দেশকে যারা বাঁচিয়ে রাখে তাদের মধ্যে অন্যতম কৃষক। আর কৃষির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সার।  কৃষিপণ্য উৎপাদনে মূল খরচ সারে। আরেকটি অংশ খরচ হয় সেচে। কৃষক পর্যায়ে সরকার যদি সারের দাম কমিয়ে আনে, তাহলে অবশ্যই উৎপাদন খরচ কমে আসবে। এতে কৃষকের পাশাপাশি ভোক্তাও উপকৃত হবে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুই দফায় সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববাজারে এখন তা কমে এসেছে। অথচ দেশের বাজারে তা সমন্বয় হচ্ছে না। উৎপাদন ব্যয় কমাতে না পারায় বিভিন্ন পণ্যের দাম নির্ধারণ করেও সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি)—এ চার ধরনের সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। রাসায়নিক এসব সারের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল।  রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ওঠে রেকর্ড সর্বোচ্চে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সে বছরের আগস্টে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়ার দাম কেজিতে ৬ টাকা বাড়ায় সরকার। গত বছরের এপ্রিলে আরেক দফায় কেজিতে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয় সব ধরনের সারের দাম। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়ার দাম ২৭ টাকা, ডিএপি ২১, টিএসপি ২৭ ও এমওপির দাম ২০ টাকা।

বিশ্ববাজারে সারের দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তা কমছে না। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু কৃষকদের ব্যয় বাড়বে বোরোসহ সামনে যে ফসলের মৌসুম রয়েছে সেগুলোরও ব্যয় বাড়বে। আবার কৃষক ফসল উৎপাদনে যেন সার কম না পান তা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে সারের সংকট হলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেটা কৃষক এবং ভোক্তার জন্য দুর্ভাবনার কারণ বেশি হবে। দেশে বার্ষিক চাহিদার বিপরীতে মোট উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশের বেশি আসে এ মৌসুমে। বোরো উৎপাদনের ওপর সারা বছরের চালের বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষির প্রায় সব উপকরণের দামই গত দুই বছরে বেড়েছে। এর মধ্যে সারের উচ্চমূল্যের কারণে বিপাকে রয়েছেন কৃষক। সেই সঙ্গে কয়েক বছর ধরে বীজ, সেচ ও সার্বিক উৎপাদন খরচ বাড়তি। এতে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতি চলমান থাকলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্যহ্রাসের সঙ্গে দেশের বাজারেও কমালে কৃষকরা এর সুফল পাবেন। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য উপকরণের দামও কমে আসবে।  

এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম নিম্নমুখী হলেও সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে। এতে দুই ধরনের প্রভাব পড়ে। প্রথমত, বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়; কিন্তু কৃষক লাভবান হন না। এতে কৃষক উৎপাদনে উৎসাহ হারাবেন। দ্বিতীয়ত, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার বাড়াতে সরকার যে আহ্বান জানাচ্ছে, তা বিঘ্নিত হতে পারে। কারণ জমি চাষে খরচ যখন বেড়ে যায়, কৃষক তখন সব জমি চাষাবাদ করেন না। এতেও উৎপাদনের ওপর একটি বিরূপ প্রভাব পড়বে। যা বাজারে উত্তাপ ছড়াবে এবং পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেবে। বিশ্ববাজারে দাম কমার সঙ্গে সরকারকে তা সমন্বয় করে নিতে হবে। বাজেটে সরকারের উচিত কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো। প্রয়োজনে কৃষকদের নগদ সহায়তা দিতে হবে।

বিশ্ববাজারে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম নিম্নমুখী হওয়া সত্ত্বেও দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ছে না। ডিজেল, কেরোসিন, বিদ্যুৎ ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই বেড়ে গেছে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ। খেত প্রস্তুত থেকে শুরু করে সেচ দেয়া, মাড়াই করা, ফসল ঘরে তোলা, শ্রমিকের মজুরি সব ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচের বোঝা টানতে হচ্ছে কৃষককে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রকৃতির বিরূপ আচরণ ও লোডশেডিং। বৈশ্বিক খাদ্য সংকট চলাকালে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হলে সবার আগে আমাদের পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দাম বেশি হলে অনেক কৃষক উৎপাদন খরচ কমাতে আগের চেয়ে কম সার ব্যবহার করবেন। এতে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সারের দাম কমিয়ে আনা জরুরি।