পেঁয়াজ উৎপাদনে সাফল্য আমাদের জন্য আশার আলো দেখালেও সংরক্ষণের ঘাটতিতে তা মলিন হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে। কেননা বিভিন্ন জাতের মিশ্রণের ফলে পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকদের বেগ পেতে হচ্ছে। এছাড়া হিমাগারের অভাবে তারা কম দামে বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ও পচা পেঁয়াজ ফেলে দিচ্ছেন। এতে দেশের বাজারে আবারো পেঁয়াজের সংকট দেখা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, এপ্রিলের শুরুতে হওয়া বৃষ্টি ও বীজের মধ্যে কয়েকটি জাতের মিশ্রণ থাকায় ফলন কমের পাশাপাশি পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। কৃষি খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, মূলত সংরক্ষণ দুর্বলতা ও ভালো জাতের অভাব পেঁয়াজ উৎপাদনের সাফল্যকে মলিন করে দিচ্ছে। তাই চাহিদার চেয়ে উৎপাদন অনেক বেশি হলেও প্রতি বছরই পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে। এর ফলে পেঁয়াজ উৎপাদনের যে সাফল্য তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটছে না।

পেঁয়াজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাবের পাশাপাশি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে জাতগুলোর ভিন্নতা। এছাড়া ভেজাল বীজের কারণে পেঁয়াজ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে। পেঁয়াজের বীজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যেও ভেজাল দিতে পিছপা হচ্ছে না অসাধু ব্যবসায়ীরা। এসব ভেজালকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা দেয়ার পাশাপাশি উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে ২০১৯ সালে পেঁয়াজ নিয়ে যে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। চলতি বছর পেঁয়াজ উৎপাদনে যে সাফল্য এসেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে পেঁয়াজ আমদানি না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে রকম পরিস্থিতিতে নতুন বছরের চার মাস না যেতেই সংরক্ষণের অভাবে আবারো পেঁয়াজ আমদানির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমন চিত্র খুবই দুঃখজনক। আমাদের নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের নিমিত্তে পেঁয়াজ উৎপাদনে যে সফলতা দেখা গিয়েছে, সেটি যেকোনো মূল্যে অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য পেঁয়াজ সংরক্ষণ ও নতুন জাত উদ্ভাবনের বিকল্প নেই।

প্রতিবেশী দেশ ভারত তাদের নিজস্ব উন্নত জাতের মাধ্যমে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। যে কারণে দেশটি নিজেদের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি পেঁয়াজ রফতানি করতে পারছে। বাংলাদেশের বাজারেও ভারতের পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। যে কারণে ভারতের পেঁয়াজের ওপর বাংলাদেশ দীর্ঘদিন নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি কমে এলেও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করতে না পারলে এ পরিস্থিতি বেশি দিন থাকবে না। আবার ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিলে ২০১৯ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে বিশ্ববাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে অনেক দেশেই পেঁয়াজের সংকট দেখা দিয়েছে। তাই বিশ্ব পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমাদের দেশের পেঁয়াজ উৎপাদন স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে উন্নত বীজ ব্যবহার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষকদের উপযুক্ত তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ভারতে ফলন ভালো হয় বলে ভারতের পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করলে চলবে না। সীমান্ত দিয়ে বীজ আনা সহজ হওয়ায় অনেক কৃষকই ভারতের বীজ ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু ভারতের পেঁয়াজের বীজ আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত না। আর বীজ সরবরাহ ব্যবসার ক্ষেত্রেও যেহেতু অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা রয়েছে, সে হিসেবে কৃষকরা যেন সঠিক বীজ চিনতে পারেন সেজন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রযুক্তির প্রসারের এ সময়েও পরিমিত হিমাগারের অভাব মূলত কৃষি খাতে অব্যবস্থাপনারই নজির। কৃষিনির্ভর দেশ হিসেবে এ অবস্থার পরিবর্তন সামগ্রিকভাবেই প্রয়োজন। এটা শুধু পেঁয়াজের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, যেকোনো সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেই অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। তাই সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। এজন্য উপযুক্ত পরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক হিমাগার স্থাপন করতে হবে।

পেঁয়াজের বীজের ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের বীজও যেন দেশে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। আর ভারতের উচ্চফলনশীল জাতের পেঁয়াজের বীজও আমাদের দেশের মাটিতে যথাযথ ফলন নিশ্চিত করতে পারছে না। এক্ষেত্রে দু-তিন জাতের পেঁয়াজ দেখা যায়, তাই আমাদের দেশের উপযোগী উচ্চফলনশীল পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করা যাবে না, অবহেলা করলে অত্যধিক দ্রব্যমূল্যের এ সময়ে নতুন করে পেঁয়াজের বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে। এছাড়া কৃষক যেন বঞ্চিত না হন, সেজন্য কৃষকের অধিকারকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। উন্নত বীজ ও সঠিক তথ্যপ্রাপ্তি কৃষকের অধিকার। এ অধিকার কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্যাপক তৎপরতা প্রয়োজন।

কৃষক যেন পেঁয়াজ উৎপাদন করতে গিয়ে লোকসানে না পড়েন এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। এজন্য পেঁয়াজ চাষে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উপযুক্ত প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। কৃষক চাষবিমুখ হয়ে পড়লে তাতে কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কৃষকের স্বার্থরক্ষা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য পেঁয়াজ সংরক্ষণের বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের যে প্রকল্প চলমান রয়েছে, তা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এছাড়া যারা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংরক্ষণ করেন, তারা যেন প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করেন সেটি নিশ্চিত করতে হবে। পরিশেষে পেঁয়াজ উৎপাদনে যে সাফল্য বাংলাদেশ পেয়েছে, তার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকুক আমরা সে প্রত্যাশাই করি। কৃষি খাতে সাফল্যই আমাদের কাম্য, এক্ষেত্রে সংরক্ষণের অভাব ও ভেজাল বীজের যে তথ্য উঠে আসছে, সেটি প্রকারান্তরে দেশের সমৃদ্ধির পথে অন্তরায়। এজন্য প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে পেঁয়াজ উৎপাদন বেশি হয় এমন জেলাগুলোয় পর্যাপ্ত হিমাগার নির্মাণ করতে হবে। এটা সত্য, আমরা এখনই পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করতে পারব না, কিন্তু পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে থাকা অবস্থায় উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রে যেন ভারসাম্য বজায় থাকে সেটি দেখভাল করা দরকার। পেঁয়াজ সংরক্ষণে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো বর্তমানে রয়েছে সেগুলো দূর হোক, নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিদ্রব্য হিসেবে পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।