রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেয়া ঋণ বকেয়া থাকলে নতুন গঠিত রফতানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিল (ইএফপিএফ) থেকে ঋণ পাবেন না উদ্যোক্তারা। নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে ওই উদ্যোক্তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেও। ২৫ এপ্রিল এ-বিষয়ক এক সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকার ইএফপিএফ থেকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে এমন কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এর মাধ্যমে মূলত রফতানি মূল্যের প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একই গ্রুপের আওতায় থাকা ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেয়ার সুযোগ থেকে বিরত রাখা। এমন প্রেক্ষাপটে ইএফপিএফ থেকে ঋণ পেতে মূল্য প্রত্যাবাসনে রফতানিকারকদের মনোযোগ বাড়ানোর প্রচেষ্টা ইতিবাচক। এতে তহবিলটির অপব্যবহার বন্ধ হবে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সক্রিয়তা প্রয়োজন। সতর্কতার সঙ্গে কেস টু কেস ভিত্তিতে এর প্রয়োগ করতে হবে। অনেক রফতানিকারক ক্রেতাদের সঙ্গে দেনদরবারে পিছিয়ে থাকায় অথবা ভিন্ন কোনো জটিলতার কারণে মূল্য প্রত্যাবাসনে সমস্যায় পড়েন। তাদের ক্ষেত্রে এমন নীতি প্রয়োগ করা হলে রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। রফতানির অর্থ প্রত্যাবাসনে সরকারের সহায়তাও জরুরি।
ইএফপিএফ পরিচালনার নীতিমালা অনুযায়ী, ঋণ সুবিধা গ্রহণকারী কোনো গ্রাহক নির্ধারিত রফতানির বিপরীতে রফতানি মূল্য অপ্রত্যাবাসিত (মেয়াদোত্তীর্ণ বা ওভারডিউ এক্সপোর্ট বিল) থাকলে এ তহবিলের আওতায় নতুনভাবে কোনো ঋণ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন না। এ সত্ত্বেও ইডিএফ থেকে ঋণ নিয়ে রফতানি করা পণ্যের মূল্য অপ্রত্যাবাসিত থাকার পরও ইএফপিএফ থেকে ঋণ গ্রহণের সুযোগ নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আসছিল। দেখা যাচ্ছে, কোনো গ্রুপের আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়েছে ইডিএফ থেকে। এর মাধ্যমে পণ্য রফতানি হলেও মূল্য প্রত্যাবাসন হয়নি। ওই একই গ্রুপের আওতায় থাকা আরেক প্রতিষ্ঠান এখন ঋণ নিতে চাইছে ইএফপিএফ থেকে। এ সুযোগ এখন থেকে আর থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে রফতানিকারকরা দ্রুত তাদের রফতানি আয় দেশে নিয়ে আসার ব্যাপারে আগ্রহী হবেন বলে প্রত্যাশা। সার্কুলারে বলা হয়েছে, যদি কোনো রফতানিকারক শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক রফতানি আদেশের বিপরীতে ইডিএফ অথবা ইএফপিএফ থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণের পর রফতানি মূল্য অপ্রত্যাবাসিত থাকে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকের পাশাপাশি ওই রফতানিকারকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা একই গ্রুপভুক্ত ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান/কোম্পানি তাদের নতুন রফতানি আদেশের বিপরীতে ইএফপিএফ থেকে কোনো ঋণসুবিধা প্রাপ্য হবে না। বকেয়া ঋণ আদায়, ডলার সাশ্রয় এবং একই সঙ্গে রফতানি বৃদ্ধির জন্য এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। তবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর।
রফতানি পণ্যের বিপরীতে যে পরিমাণ আয় দেশে আসার কথা তা আসছে না। ব্যাপক ব্যবধান থেকে যাচ্ছে ইপিবির পরিসংখ্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি আয়ের তথ্যে। সংস্থা দুটির প্রায় তিন বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এ সময় রফতানি পণ্যের বিপরীতে অপ্রত্যাবাসিত অর্থের পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিডের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে এ পর্যন্ত ক্রেতা ও রফতানিকারকের বাণিজ্য বিরোধের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে রফতানির বিপরীতে মূল্য হ্রাসের ঘটনাও বেড়েছে। আবার ঋণপত্রের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সময়সীমাও বেড়ে গেছে। এ সবকিছুরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রফতানির বিপরীতে প্রত্যাবাসিত অর্থের পরিসংখ্যানে। নিয়মিতভাবেই রফতানির উদ্দেশ্যে জাহাজীকৃত পণ্যের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ইপিবি। আর সে রফতানির বিপরীতে আয় প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্য বিরোধের প্রেক্ষাপটে মূল্য হ্রাসের কারণে এ দুই পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে রফতানির বিপরীতে প্রত্যাবাসিত অর্থের পরিমাণও কম হতে পারে। তবে তা কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। আবার অর্থ পরিশোধের সময়সীমাও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে রফতানির বিপরীতে অর্থপ্রাপ্তির পার্থক্য খুব বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ক্রেতা ও রফতানিকারকদের যোগসাজশে অর্থ পাচারের শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। অর্থবছরের হিসাবে রফতানি হওয়া পণ্য ও সেগুলোর বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের পার্থক্য রয়েছে। এর কারণ হলো রফতানির পরও অনেক সময় ক্রেতা ডিসকাউন্ট দিয়েছে। বিধান আছে ১০ শতাংশের বেশি ডিসকাউন্ট করা যাবে না। রফতানিকারকদের দরকষাকষির সক্ষমতায় ঘাটতির কারণে ডিসকাউন্টের হার অনেক বেড়ে যায়। অনেক সময় ক্রেতা কোনো না কোনো কারণে পণ্যের চালান গ্রহণই করেননি, অর্থাৎ ডেলিভারি না নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে রফতানি পণ্যের বিপরীতে কোনো অর্থই আসেনি। এক্ষেত্রে রফতানিকারকের স্বার্থে ব্যাংকারদের কঠোর ভূমিকাও অনেক সময় পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মূল্য অপ্রত্যাবাসনে ঋণ প্রদান বন্ধ রাখতে কেস টু কেস ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্বচ্ছ ভূমিকা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খাতকে সহায়তা প্রদানের জন্য তহবিল গঠন করে থাকে। কৃষি ঋণ তহবিল, রফতানি উন্নয়ন তহবিল, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিল্প উন্নয়ন সহায়তা, করোনা সহায়তা তহবিল এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অনেক সময়ই ভালো উদ্দেশ্যে গঠিত এসব তহবিলের অর্থ অপব্যবহার হয়েছে। ফলে তহবিলগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণভাবে সফলতা লাভ করতে পারেনি। অনেক তহবিল পরবর্তী সময়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে অর্থায়ন সংকটে পড়ে। তহবিলের অর্থ ঋণ হিসেবে দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তা ফেরত আসা সাপেক্ষে নতুন গ্রাহক এর সুবিধা ভোগ করতে পারে। কিন্তু ঋণের অর্থ ফেরত না এলে সেটি আর কাজে ব্যবহার হতে পারে না। ফলে সম্ভাবনাময় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তাই সময়ে সময়ে তহবিলের ব্যবস্থাপনায় নির্দেশনা দিয়ে থাকে। ইডিএফ ও ইএফপিএফের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা তাৎপর্যপূর্ণ। নির্দেশনার সঠিক বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর যারা এ তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত। কোন কোম্পানি ইচ্ছাকৃত আর কোন কোম্পানি অনিচ্ছাকৃতভাবে মূল্য প্রত্যাবাসন করছে সেটি যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার বিধান করা যেতে পারে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। নির্দেশনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেটিরও তদারকি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাই মুখ্য।










