ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিশ্বব্যাপী বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। কেবল বজ্রপাত নয়, এতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যেও একটি এ দেশ। দেশের বজ্রপাত পরিস্থিতি এবং হতাহতের ঘটনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণকারী বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের হিসাবে, ২০১০-২৪ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে বজ্রপাতে প্রাণ গেছে ৪ হাজার ১৫৮ জনের। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২৯৭ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন। অবশ্য জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে ৩০০ মানুষ মারা যায়। বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি বছরই দেখা যায় বজ্রপাতে মৃতদের প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিকাজে জড়িত। বণিক বার্তার সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদন থেকেও বজ্রপাতে বিভিন্ন জেলায় কৃষকের মৃত্যুর খবর জানা গেছে। গত সোমবার সকালে কাঁকরোল খেতে কাজ করা অবস্থায় বজ্রপাতে মারা যান চট্টগ্রামের বাঁশখালীর একজন কৃষক। এর আগের দিন, রোববার বিকালে কিশোরগঞ্জের ভৈরব, কুলিয়ারচর ও হোসেনপুর উপজেলায় বজ্রপাতের ঘটনায় তিন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বেলা ৩টার দিকে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয়। তার আগে থেকেই জমিতে কাজ করছিলেন ওই তিন কৃষক।
প্রাক-বর্ষা মৌসুম এবং বর্ষাকালে তীব্র সৌর বিকিরণ থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ঘন ঘন বজ্রপাত হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে এটি চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত সময় হওয়ায় কৃষক ও জেলেরা বজ্রপাতে হতাহতের বিশেষ ঝুঁকিতে থাকেন। এতে কৃষকের প্রাণহানি ঘটছে। সেই সঙ্গে কৃষি খাতও প্রভাবিত হচ্ছে। এ নিয়ে সম্প্রতি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) দুজন শিক্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এ গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো ধান কাটা ও আমন রোপণসহ গ্রীষ্মকালীন ফল ও সবজি উৎপাদন-সংগ্রহের প্রধান মৌসুম এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাস। আবার বজ্রপাতও এই তিন মাসেই বেশি হয়। ফলে কৃষকরা ঝুঁকিতে রয়েছেন বেশি। এদিকে যেসব জেলা কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, বজ্রপাতের হটস্পটও সেসব জেলা। ফলে কৃষকের মৃত্যু পরোক্ষভাবে হলেও কৃষি খাতকে প্রভাবিত করছে। আশঙ্কা রয়েছে, এভাবে কৃষক মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকলে তা কৃষিকাজকে নিরুসাহিত করতে পারে। কৃষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে তারা পেশা পরিবর্তন করবেন।
দুঃখজনক বিষয় হলো, ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর সুদীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বজ্রপাত মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য সফলতা নেই। বরং ব্যর্থতার পাল্লায় ভারী হচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা বলে আসছেন, বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা। বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটে হাওরাঞ্চলে। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও ময়মনসিংহকে বজ্রপাত-ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গত বছর বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে সিলেট জেলায়। এবার বিশেষজ্ঞরা কৃষিনির্ভর জেলাগুলোকেও বজ্রপাতের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কৃষিজমি বা হাওর এলাকায় সাধারণত বড় কোনো গাছ থাকে না। আর বজ্রপাতের ধর্ম হলো তা মাটিতে আঘাত হানার আগে সবচেয়ে উঁচু স্থানে গিয়ে পড়ে। কৃষি বা হাওর এলাকায় কৃষকের শরীরই মাটির চেয়ে উঁচুতে থাকে। যে কারণে কৃষক বজ্রপাতের শিকার হন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তথ্যপ্রযুক্তি বা কার্যকর কৌশল ব্যবহার করে বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়েছে। যেখানে দেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে ৩০০ মানুষ মারা যায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাতের কারণে বছরে ২০ জনেরও কম মানুষ মারা যায়। এখানে কেবল বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় প্রকল্প নেয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। এক্ষেত্রে সচেতনতা বা সতর্কতাও বড় ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সেটিও সম্ভব হয়নি। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন ও মানুষকে সচেতন করে মৃত্যুহার কমিয়ে আনা হয়েছে। আবার বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে আগে থেকেই জানা যায়, কোন এলাকায় কোন সময় বজ্রপাত ঘটবে। অর্থাৎ কোনো এলাকার ওপর দিয়ে বজ্রমেঘ প্রবাহিত হবে কিনা তা বলা যায়। এর পরও বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
কৃষকদের সুরক্ষায় দিতে হলে তাদের দোরগোড়ায় বজ্রপাতের পূর্বাভাস পৌঁছে দিতে হবে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার উপাত্তে দেখা গেছে, বজ্রপাতের ঘটনা সাধারণত ভোরবেলা, বেলা ১১টা-১টা এবং বিকাল ৫-৬টার মধ্যে বেশি ঘটে। আর এ সময়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রেডিও-টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমসহ স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বজ্রপাতের সময় সবাইকে জানানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ সময় কৃষকসহ সবাই যেন প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেন, সে বিষয়ে তাদের অবগত করা আবশ্যক। কৃষকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। সেই সঙ্গে হটস্পটগুলোয় বজ্রপাত প্রতিরোধী আশ্রয়স্থল গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে বজ্রপাত শুরু হলে কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।
এক সময় বজ্রপাত প্রতিরোধের জন্য অনেক ভবনে বজ্রনিরোধক দণ্ড ব্যবহৃত হতো। এখন এর ব্যবহার অনেকটা কমে এসেছে। আবার খোলা স্থানের বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা টাওয়ারে লাইটনিং অ্যারেস্টার দিয়ে বজ্রপাত নিরোধের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এসব অ্যারেস্টার ঠিকমতো কাজ করে কিনা সে বিষয়ে তদারকি নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কৃষি মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বজ্রপাত নিয়ে আগাম পূর্বাভাস দিতে হবে। পাশাপাশি বজ্রনিরোধক অবকাঠামো নির্মাণ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রমে জোর দিতে হবে।
দেশের কৃষি খাত এমনিতেও নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি, জমির সংকটসহ নানা কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এতে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হবে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে হলে বজ্রপাত প্রতিরোধে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর দ্রুত বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। কৃষকের তাৎক্ষণিক সুরক্ষার পাশাপাশি কৃষির সুরক্ষায় নিশ্চয় সেই পরিকল্পনা হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই।










