পাটিগণিতে সুদ কষা কিংবা ঐকিক নিয়মের অংকের বেড়াজালে জড়িয়ে কত যে জটিলতায় কেটেছে ছাত্রজীবন তার ইয়ত্তা নেই। অন্যের জীবনের হিসাবনিকাশ নিয়ে অংক কষতে কষতে কত ছাত্রের মাথার চুল হারিয়ে গেছে, পরীক্ষার সময় চন্দ্রাহত হয়েছে তাও হিসাবের বাইরে। 

অমুক সাহেবের মাসিক আয় অত টাকা, ব্যয় তত টাকা, তার সংসারের সদস্য সংখ্যা এতজন, তাদের জন্য মাসে চাল লাগে তত মণ, চালের কেজি অত টাকা, সাথে আলু, পেঁয়াজ, মরিচের জন্য খরচ অত টাকা, চিকিৎসা বাবদ খরচ তত টাকা, মাস শেষে তার জমা কত থাকবে কিংবা কত টাকা ধার করতে হবে, বছর শেষে তার সম্পদের স্থিতি কত হবে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। কিশোর বয়সে মনে প্রশ্ন জাগত, অন্যের সংসারের এত হিসাব করে আমার কী লাভ অথবা এসব শেখার আদতে কি প্রয়োজন আছে? কিন্তু প্রতিদিনের বাজারের হিসাব, আয়-ব্যয় ইত্যাদির হিসাব বাবা তার নির্দিষ্ট ‘হিসাবের দুনিয়া’ খাতায় লিখে রাখতেন এবং আড়ালে-আবডালে সে খাতার পাঠোদ্ধারে মনে হতো অমুক সাহেবের দুনিয়াটা বড় কঠিন এবং হিসাবটা জানাও জরুরি। 

যদিও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে সবার জন্য এসব হিসাব রাখা জরুরি নয় বরং পাটিগণিতের সুদ কষা, ঐকিক নিয়মের অংকে হিসাবনিকাশের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় প্রশ্ন ও সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন জরুরি। মতিউর সাহেব, আবেদ সাহেব, অমুক সাহেব, তমুক সাহেবদের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রচলিত হিসাব পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েই দিয়েছে। ফলে চলমান উদাহরণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে সমস্যা সমাধানের পথ দেখানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে মনে বলে হয়।

এখন ঐকিক নিয়মের অংকের সমস্যা সমাধানে বলা যেতে পারে—মতিউর সাহেব একজন সরকারি কর্মকর্তা, তিনি মাসে সর্বসাকল্যে বেতন, বাসা ভাড়া ও অন্যান্য আনুতোষিকসহ যে টাকা পান তার পরিমাণ ১ লাখ টাকা থেকে কিছু বেশি হতে পারে। তার দুই স্ত্রী, সন্তানদের জন্য মাসে যে খরচ, তা তার বেতনের অনেক গুণ বেশি। গত ঈদুল আজহায় তার ছেলে ১৫ লাখ টাকার ছাগল কেনার জন্য বায়না দেন এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে ৭০ লাখ টাকার গরু কিনেছেন। ছেলের কাছে রয়েছে লাখ লাখ টাকার নানান দুর্লভ পশু-পাখিও। এছাড়া তার ও স্ত্রীদের নামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। মতিউর রহমান সাহেবের আয় থেকে অনেক গুণ বেশি ব্যয় তিনি কীভাবে নির্বাহ করেন এবং বিশাল সম্পদের স্থিতি গড়তে পারেন সেটি নিয়ে একক কাজ ও দলীয় কাজের মাধ্যমে একটি সমাধানপত্র তৈরি করো (সমাধানপত্রে যে বিষয়গুলো আলোকপাত করতে হবে সে ধাপগুলো পর্যায়ক্রমে দেয়া আছে)।

বিষয়টি একটি কল্পিত সমস্যাপত্র, কিন্তু বর্ণিত ঘটনা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে সত্যি। বর্তমান কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নে সুন্দর একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যেটি শিক্ষার্থীর সত্যিকার মেধা মূল্যায়নে যেমন সহায়ক হতে পারে, তেমনি চিন্তার বিকাশ ঘটাতে পারে। পরীক্ষা কক্ষে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় নিয়ে লম্বা সমস্যাপত্রের সমাধান দিয়ে থাকেন, এ সমস্যাপত্র সমাধানে যা বেশ কাজে দেবে বলে মনে হয়। শিক্ষার্থীদের সুবিধা কিংবা ক্ষেত্রমতে অসুবিধা হচ্ছে, অমুক সাহেবের টানাটানির সংসারে কীভাবে সীমিত আয়ে সংসার চালাবেন সে হিসাব করতে হবে না, বরং মতিউর সাহেবের বেতনের চেয়ে তার সম্পদের ভাণ্ডার যেহেতু বেশি তাই শিক্ষার্থীরাও সমস্যা সমাধানে টানাটানিতে না পড়ে বরং সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। আরেকটি সমস্যাপত্র কল্পনা করা যেতে পারে এভাবে, যেখানে ঘটনায় বর্ণিত ব্যক্তি এবং তথ্যগুলো পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদমতে সত্য। যেমন সৈয়দ আবেদ সাহেব একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার গাড়িচালক তার মাসিক বেতন কয়েক হাজার টাকা। মাসে তার খরচ কয়েক লাখ টাকা এবং তার স্থিতি সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। সৈয়দ সাহেব হাজার কয়েক টাকার বেতনে লাখ টাকার মাসিক খরচ কীভাবে নির্বাহ করেন এবং স্থিতি হিসেবে কী কী উপায়ে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের মালিক হতে পারেন তার একটি সম্ভাব্য সমাধানপত্র তৈরি করো, এমন প্রশ্নও হতে পারে। এক্ষেত্রে তার সম্পদের উৎসগুলো কী কী হতে পারে তা দলীয় আলোচনার মাধ্যমে নির্ণয় করো (তথ্য-উপাত্তের জন্য সংবাদপত্রের সহায়তা নিতে পারো) এবং উপসংহারে একক মতামত দাও। এখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অনেকে অস্বাভাবিক জটিলতায় পড়ে যাবে হয়তো, কারণ এদের অনেকেরই এ রকম অস্বাভাবিক ঘটনার সঙ্গে পরিচয় নেই, যাদের পরিচয় আছে তাদের সিংহভাগই এ রকম প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেয় না, তাদের প্রশ্নের ধরন ও ভাষা ভিন্ন এবং ভিনদেশী। অতএব পরীক্ষা কক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় তথ্য সহায়তার জন্য ইন্টারনেট সংযোগসহ ডিভাইস থাকতে হবে। 

ওপরে দেয়া উদাহরণের ব্যক্তিদের সম্পর্কে এমন তথ্য-উপাত্ত হাজির করছে গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের ওপর বিশ্বাসও রাখছি, কিন্তু প্রশ্নপত্রের যে কাঠামো উপস্থাপন করা হয়েছে তা নিতান্ত কল্পনাপ্রসূত। তবে সমাজে চলমান ঘটনা, সমস্যা নিয়েই তো আমাদের আলোচনা এবং সমাধান প্রক্রিয়া, অতএব এমন প্রশ্ন পাটিগণিত শেখায় চলেও আসতে পারে। না আসুক সেটাই কামনা। 

ঐকিক নিয়ম শেষে সুদ কষা, লাভ-ক্ষতি নিয়েও এখন সংস্কার আবশ্যক। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, কিছু ব্যাংকে কিংবা লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের জমা রাখা আমানত লাপাত্তা। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে জমা রাখা টাকা-পয়সা হাওয়া। খবর চাউর হওয়ার পর গ্রাহকরা হইহুল্লোড়, আন্দোলন-সংগ্রাম করে, কিছুদিন দোষীদের ধরপাকড় চলে(?) সবশেষে ক্ষুদ্রসঞ্চয়ী তার সঞ্চয় হারিয়ে কোথায় গিয়ে ঠেকেন সে খবর কেউ রাখে না। তবে তুখোড় ও চতুর আমানতকারী যে পরিমাণ আমানত রাখেন তার অধিক গুণ ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিয়ে ‘বিশিষ্ট ঋণখেলাপি’ উপাধি নিয়ে সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং আদতে তার কোনো ক্ষতি হয় না। এ কারণে ব্যাংকে কিংবা লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানে আমানতের বিপরীতে সুদ/লভ্যাংশ পাওয়ার বিষয়টিও আমজনতার কাছে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলছে আর এ নিয়ে নানা গুজব তো থেকেই যায়। তাহলে পাটিগণিতের প্রচলিত সুদ কষা, লাভ-ক্ষতির হিসাব শেখানোর ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের সামনে উদাহরণ অথবা সমস্যা উপস্থাপনে পরিবর্তন জরুরি হতে পারে। যেমন ধরুন, পাটিগণিতে সুদ কষার ক্ষেত্রে প্রশ্ন হতে পারে, ‘ক’ সাহেব তার চাকরিজীবনে সঞ্চিত প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা অত শতাংশ হার সুদে ‘খ’ নামের ব্যাংকে/লগ্নিপ্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট মেয়াদে গচ্ছিত রেখেছেন, যাতে গচ্ছিত আমানতের বিপরীতে প্রতি মাসে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে তার পেনশনে প্রাপ্ত টাকার অতিরিক্ত যে খরচ হচ্ছে সেটি মেটাতে পারেন। কিন্তু হঠাৎ করে যেখানে আমানত রেখেছিলেন সে প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া/লাপাত্তা হয়ে যায়। ফলে ‘ক’-এর জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে। এক্ষেত্রে সঞ্চয় ও মুনাফা হারিয়ে ‘ক’ সাহেবের কী পরিমাণ ক্ষতি হয় এবং ক্ষতির কারণে প্রতি মাসে যে আর্থিক ঘাটতি দেখা দেয় তা পুষিয়ে নিতে তিনি কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন তা নিয়ে একক এবং দলীয়ভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন তৈরি করো। 

পাটিগণিতে প্রচলিত সুদ কষা, লাভ-ক্ষতি সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তার প্রচলিত ধারাটি হারালেও নতুন হিসাব চালু হতে পারে যার নাম ‘ঘুস কষা’। যেমন ‘অমুক’ অফিসের ‘তমুক’ সাহেব একটি কাজের জন্য অত টাকা ঘুস গ্রহণ করেন এবং ‘অতটি’ কাজের প্যাকেজ হলে ‘এত শতাংশ’ টাকা ছাড় দেন। তিনি দিনে এত সংখ্যক ‘প্যাকেজে’ কাজ করলে তার দৈনিক ঘুস আয় কত হবে এবং কোটি টাকা আয় করতে তার কত সময় লাগবে তা নির্ণয় করো। তথ্য হিসেবে মতিউর সাহেব, আবেদ সাহেব কিংবা নজীর বিহীন তথ্য ‘এত’, ‘অত’-এর জায়গায় বসানো যেতে পারে। এখানে ঘুস গ্রহীতা অত শতাংশ ছাড় দেয়ার কারণে ঘুসদাতা কী পরিমাণ লাভবান হতে পারেন তার বর্ণনাও যোগ করা যেতে পারেন। 

পাটিগণিতে কী অন্তর্ভুক্ত করা উচিত আর কী বাদ দেয়া উচিত সেটি নীতিনির্ধারক, গণিতবিদ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পরিবর্তন হতে পারে এবং প্রশ্নকর্তারা এমন প্রশ্ন পরীক্ষায় করেও বসতে পারেন। সে যা-ই হোক, মতিউর, আবেদ আলীসহ নানাজনের টাকার পাহাড় গড়ার যে কাহিনী পত্রপত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন পাওয়া যাচ্ছে তা সুখকর নয়। সৈয়দ ড্রাইভাররা গাড়ি চালনার সঙ্গে সঙ্গে তার বড় সাহেবের ফুট-ফরমাশ খেটে প্রথমে কাছে ঘেঁষেন, মাঝেমধ্যে নানা উপহার নিয়ে হাজির হন, বড় সাহেবের মন জয় করেন, তারপর একটু-আধটু আবদার-সুপারিশ সফল হলেই আর ঠেকায় কে? যত সুপারিশ সফল হয় তত টাকা আসে, ক্ষেত্রবিশেষে বড় সাহেবরাও ভাগ পান। এরপর সৈয়দ সাহেবের টাকা আয়ের গতি তার গাড়ির চাকার গতিকে অতিক্রম করে। টাকার শক্তিতে পুত্রকে ভিড়িয়ে দেন ক্ষমতাশালীদের দলে, আর টাকাই যেখানে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার মূল উপাদান সেখানে তরতর করে ওপরে ওঠার ব্যবস্থাও হয়ে যায় সৈয়দ তনয়দের। জননন্দিত বহুব্রীহি নাটকের একটি ডায়ালগ মনে পড়ে গেল, যেখানে নাটকের এক বিশেষ চরিত্র মোবারক যিনি একপর্যায়ে বললেন, ‘সৈয়দ বংশের পোলা মামা, চুরি করতে পারমু কিন্তু রিকশা চালাইতে পারমু না’। সৈয়দ আবেদ সাহেব রিকশা তো দূরের কথা গাড়ি চালাতেও পারলেন না বরং পরের কাজটি করা তার জন্য সহজ ও সম্মানজনক মনে হলো। এমন কত সৈয়দ সাহেব সমাজে আছেন যারা কত কর্তাকে ভজিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, সন্তানদের নিজ বিদ্যায় পারদর্শী করেছেন তার হিসাব মেলা ভাড়। তবে বড় কর্তাও যে লাভ-ক্ষতির হিসাবে শামিল হননি সে কথা হলফ করে বলা যাবে না।

আবার পাটিগণিতের নিয়মে ফিরে যাই। মতিউর, আবেদ আলী, নজিরবিহীন কাণ্ড যেমন পাটিগণিত শিক্ষায় পরিবর্তনের তাগিদ দেয় তেমনি সমাজে করিম (প্রতীকী) সাহেবও আছেন যার বেতন মতিউর সাহেবের বেতনের সমান এবং তাকে মাসের ২০ তারিখের পর সংসারের খরচ নির্বাহের জন্য লোন করতে হয়। এক্ষেত্রে পাটিগণিতে করিম সাহেব তার সংসারে চাল, ডাল, তেল, লবণ, ওষুধ কেনার খরচ কত শতাংশ হারে কমালে প্রাপ্ত বেতনে সংসার চালাতে পারবেন এবং লোন করতে হবে না, সে বিষয়ে সমাধানপত্র তৈরিতে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা এখানেও হয়তো জটিলতায় পড়তে পারেন। কারণ বাজার সিন্ডিকেটের কারণে জিনিসপত্রের দাম সকাল-বিকাল পরিবর্তন হয়, তাই করিম সাহেবের জন্য কোন বাজারদর ঠিক করে হিসাব করবেন সেটি নির্ধারণ করা কঠিন। 

মতিউর, আবেদ সাহেবদের সংখ্যা যে করিম সাহেবদের চেয়ে বেড়ে গেছে তেমনটাও হয়তো নয়, তবে টাকা যেখানে ক্ষমতা ও মর্যাদার মাপকাঠি সেখানে করিম সাহেবরা সংখ্যায় বেশি থাকলেও অসহায়। মতিউর সাহেবদের রাষ্ট্র যত দেয় তত তাদের চাহিদা বেড়ে যায়। রাষ্ট্র তাদের গাড়ি দেয়, বাড়ি করার টাকা দেয় এমনকি গাড়ির চলাচলের জন্য তেলও দেয়, তার পরও চাই আর চাই। আর বড় কর্তার চাওয়া দেখে তার গাড়িচালকের একটু লোভ জাগতেই পারে।

সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা ‘পণ্ডিত মশাই’ গল্পের কথা হয়তো অনেকের মনে থাকতে পারে। গল্পের এক জায়গায় পণ্ডিত মশাই ছাত্রদের কাছে জানতে চাইলেন ‘স্কুল ইন্সপেক্টরের তিন ঠেঙে কুকুরের পেছনে ব্যয় মাসে ৭৫ টাকা। আর বিদ্যালয়ের পণ্ডিত মশাইয়ের মাসিক বেতন ২৫ টাকা। তাহলে পণ্ডিত মশাইয়ের বেতন ইন্সপেক্টরের কুকুরের কয় ঠ্যাংয়ের সমান? এখানেও পাটিগণিতের ঐকিক নিয়ম। অধুনাকালে অনেক সাহেবের গাড়ির তেলের পেছনে যে পরিমাণ টাকা ব্যয় হয় অনেক কর্মচারীর বেতনও তত নয়। মানে দাঁড়ায়, অনেকের জীবনমান সাহেবের গাড়ির তেলের খরচের চেয়েও কম কিংবা সমান। 

গণিতের অনেক বিষয় নিয়ে কল্পনা ও সত্যের মিশেলে একঘেয়ে কথা হলো। এবার না হয় স্কুলে শেখা বানরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠা এবং পিছলে পড়ার মজার অংকটা দিয়ে শেষ করি। পাটিগণিতে একটি প্রশ্ন ছিল—‘একটি তৈলাক্ত বাঁশ বাহিয়া, একটি বানর ১ম মিনিটে ৩ মিটার উঠিয়া যায়। কিন্তু ২য় মিনিটে ২ মিটার নিচে নামিয়া যায়। বাঁশটির উচ্চতা ৫০ মিটার হলে বানরটির বাঁশের আগায় চড়িতে কত সময় লাগিবে? 

কিশোরবেলায় স্কুলে এ গাণিতিক সমস্যাটির সমাধান করতে গিয়ে অনেক বন্ধুকে দেখেছি বানরের ওপর ক্ষেপে গেছে, এজন্য যে তৈলাক্ত বাঁশে কেনইবা বানর উঠতে গেল আর বাঁশের মাথায় উঠতে কত সময় লাগবে সেটি সমাধানের কঠিন দায়িত্বটি তার ওপর পড়ল। আবার কেউবা ক্ষেপে গেছে যিনি বাঁশে তেল লাগিয়ে বানরটিকে এমন ওঠানামা করিয়ে কষ্ট দিয়েছে তার ওপর। কিশোর বয়সে কষ্ট দেয়া বানর ও তেল মাখা বাঁশ এখন একটি গাণিতিক সমস্যা সমাধানে সাহায্য করছে—এজন্য চিত্ত প্রফুল্ল। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া এ মুহূর্তের তথ্য বলছে আমাদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৮৪ ডলার। বাংলাদেশের টাকার হিসেবে যা অনেক টাকা। তথ্যটি সত্য এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাও আমাদের অচিরেই মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের পক্ষে ইঙ্গিত দিয়েছে এবং আমরা আশাবাদী। এত টাকা যেখানে মাথাপিছু আয় সেখানে অছিম উদ্দিনের (কাল্পনিক) কেন টাকার অভাবে বস্তির নোংরা পরিবেশে থেকে মাঝেমধ্যে খেয়ে না খেয়ে জীবনপাত করতে হয়? তৈলাক্ত বাঁশ ও বানরের উত্তর দিয়ে দিতে পারে। মাথাপিছু আয় ওপরের দিকে উঠছে ঠিকই কিন্তু উড্ডয়নের পথ তৈলাক্ত করে রাখায় আয়ের সিংহভাগ মতিউর থেকে নজিরবিহীন আবেদ আলীদের পকেটে ঢুকে যাচ্ছে। ফলে শেষ প্রান্তে থাকা প্রান্তিকজনের কাছে গিয়ে পৌঁছতে পারছে সামান্য। এ কারণে মাথাপিছু আয়টি আর প্রত্যেকের মাথায় সমান হারে জমা হচ্ছে না কেবলই গড় রয়ে যাচ্ছে এবং নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত গড় হিসাবে যা দেখাচ্ছে তা প্রত্যেকের মাথায় পড়ছে না (তবে চতুর পরিসংখ্যানবিদ আবার তার ‘মিডিয়ান’ তত্ত্ব দিয়ে ভেলকিবাজির হিসাবও দাঁড় করতে পারেন, যেখানে টাকা সুষম হারে সবার কাছে পৌঁছে গেছে)।

আয়কে প্রকৃতপক্ষে সবার মাথায় ভাগ করে দিতে গেলে নির্দিষ্ট কিছু পকেটে অঢেল অর্থ ঢোকার তৈলাক্ত পথ বন্ধ করতে হবে, না হয় বেচারা বানর লাফ দিয়ে হলেও বাঁশের মাথায় হয়তো উঠবে, কিন্তু আমজনতার মাথাপিছু উন্নয়নের উন্নতি হবে না মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে তাদের জীবন মানেরও তেমন পরিবর্তন হবে না এবং সেক্ষেত্রে সামাজিক প্রেক্ষাপটে পাল্টাতে হতে পারে পাটিগণিতের হিসাবনিকাশ। 

এএসএম সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়