কভিড মহামারী সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকাকালীন অনেক ভারতীয় অর্থনীতিবিদ এবং সমসাময়িক ভাষ্যকাররা বিশ্বাস করেছিলেন যে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির গতিও আকাশচুম্বী হয়ে যাবে। কিন্তু মহামারীর সর্বোচ্চ পর্যায় পার হওয়ার দুই বছর পর দেশটির শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতির প্রত্যাশিত উত্থান হয়নি। এটি আসন্ন বলেও মনে হচ্ছে না।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর আলোকপাত করা যেতে পারে। যদিও অনেক বিশ্লেষক ভারতের সম্ভাব্য বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে ৮ শতাংশ অর্জনের অনুমান করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলো জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো দুর্বল। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণের হার কিছুটা কমে গেছে। একদিকে উচ্চমূল্যের পরিষেবা রফতানি বেড়েছে, অন্যদিকে উৎপাদনভিত্তিক রফতানির বিশ্ববাজারের অংশ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানও কিন্তু উদ্বেগজনক দেখাচ্ছে। সেন্টার ফর মনিটরিং দ্য ইন্ডিয়ান ইকোনমির তথ্য অনুসারে, ভারতের শ্রমিক-জনসংখ্যা অনুপাত, যা কিনা চাকরির সুযোগের সর্বোত্তম পরিমাপ করা যায় তা ২০১৬ সালে প্রায় ৪৪ থেকে বর্তমানে ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তার ওপর অনেক শিল্প শ্রমিক কৃষিতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ উৎপাদন খাতের মোট কর্মসংস্থানের অংশ এখনো প্রাক-মহামারী স্তরের নিচে রয়েছে। কলেজ পর্যায়ের ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বেকার বা স্বল্প মজুরির কাজে নিযুক্ত, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের দুরবস্থার প্রমাণ দিচ্ছে। তাদের জন্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ এখন ডেমোগ্রাফিক হতাশায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি তিন বছর ধরে ৬ শতাংশের ঘরে আটকে রয়েছে। খাদ্যদ্রব্যের ক্রমবর্ধমান দাম বাড়ার কারণেই উচ্চমূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। উচ্চমূল্যস্ফীতিতে দরিদ্ররা খুবই কষ্টে রয়েছে, অনেকে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের পরিসংখ্যান রাজনৈতিক নেতাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতীতের বিভিন্ন সময়ে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর পতনের পেছনে উচ্চমূল্যস্ফীতি বড় ভূমিকা রেখেছে। এমনি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, ১৯৯৮ সালে পেঁয়াজের দাম বাড়ার ফলে বিজেপি শাসিত দিল্লি সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া। তবে এবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দাবি খুবই ক্ষীণ। এক্ষেত্রে তিনটি ব্যাখ্যা আছে।
প্রথমত, বেশির ভাগ ভারতীয় বিশ্বাস করে যে সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো শেষ পর্যন্ত বড় মাপের সাফল্য অর্জন করবে। অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকি সুবিধার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভারতে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা ভাবছে। অ্যাপল কোম্পানি ভারতে তাদের আইফোন উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এটি তার অন্যতম উদাহরণ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রবাহে ভারত বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে উন্নীত হবে। এতে ভারতের রফতানি বেড়ে উঠে অর্থনীতি গতিশীল হবে ঠিক যেভাবে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, ভোটারদের আচরণকে প্রভাবিত করে এমন অনেক বিষয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নতি একটি মাত্র। এছাড়া রয়েছে নেতাদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, রাজনৈতিক বিকল্প এবং নাগরিকদের অসন্তোষ প্রকাশের উপায়গুলোর মতো বিষয়।
তৃতীয় সম্ভাবনাটি এখনো অবমূল্যায়িত রয়ে গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মতো জনসেবা পণ্যগুলোর বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনন্য যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, যাকে আমরা নিউ ওয়েলফেয়ারিজম নামে অভিহিত করেছি, সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নিশ্চিতের মতো বিষয়ে অর্থায়নের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যা মূলত অত্যাবশ্যক তবে সাধারণত বেসরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
সত্যি করে বললে, খুব কম ভারতীয় সরকারই জনসেবা সরবরাহের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। সর্বোপরি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারগুলোর পরিমাপযোগ্য ফলাফল পেতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগে। আর প্রায় সামান্য রাজনৈতিক ফলাফল সৃষ্টি করে এবং নীতিনির্ধারকদের তা অনুসরণ করার জন্য খুব কম প্রণোদনা দেয়া হয়।
তার পরিবর্তে সরকার সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। মোদির পূর্বসূরি মনমোহন সিং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে কর রাজস্ব আদায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবিধাগুলো আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, আর তাই দেশব্যাপী গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি প্রকল্প চালু করেছিলেন এবং বিদ্যমান খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচিগুলোকে সম্প্রসারিত বৈধ সুবিধায় রূপান্তর করেছিলেন। দুজনই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। এসব কর্মসূচির সুফল পাওয়া গেছে মহামারীর সময়ে যখন লক্ষাধিক নতুন বেকার অভিবাসী গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
মোদি সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে এ সুরক্ষা বেষ্টনী পেয়েছিল এবং সেটির ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিল। তবে কোনো ধরনের নিজস্ব উৎসাহ ছাড়াই। বিদ্যমান প্রকল্পগুলোকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে মোদি সরকার রান্নার গ্যাস, টয়লেট, বিদ্যুৎ, আবাসন ও পানির জন্য নগদ অর্থ প্রদান এবং ভর্তুকি প্রদানের দিকে মনোনিবেশ করেছে। এ প্রচেষ্টা অসাধারণভাবে সফল হয়েছে, এসব পণ্য ও পরিষেবা নিশ্চিতে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও কিছু সরকারি দাবি শুনতে অতিরঞ্জিত লাগে।
নিউ ওয়েলফেয়ারিজমের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে যে মিল রয়েছে সেটা হলো যে তারা উভয়ই আরোপযোগ্য ও বাস্তবিক। শুধু কথা নয়, ভারতের নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করে দক্ষতার সঙ্গে নগদ অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে। শিক্ষা সংস্কারের বিপরীতে সেবাপণ্যগুলো ভবিষ্যতের কোনো সময়ে নয়, বরং আজকেই জনগণ উপকৃত হচ্ছে। এভাবে জনগণের অনেক মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। মোদির কৌশল তাই যুক্তিযুক্তভাবে ভারতীয়দের জীবনযাত্রার মানকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে।
নগদ অর্থ স্থানান্তর বৃদ্ধি খুবই চ্যালেঞ্জিং। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার সরাসরি নগদ অর্থে প্রদান করা হয়েছে। ২৬৫টি সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন (সবাই স্বতন্ত্র নয়) মানুষ উপকৃত হচ্ছে। যদি রাজ্য সরকারগুলোর নগদ স্থানান্তর হিসাব করা হয় তবে এ সংখ্যা আরো বড় হবে। একত্রে নগদ স্থানান্তরগুলো একটি সর্বজনীন মৌলিক আয়ের সমতুল্য—যে আইডিয়াটি ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা থাকাকালীন সরকারকে দিয়েছিলাম।
এ পটভূমিতে নিউ ওয়েলফেয়ারিজমের ভূমিকা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে, আরোপযোগ্য বাস্তবিক পণ্য সরবরাহ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন মোদির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। নিউ ওয়েলফেয়ারিজম সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ এবং উচ্চ খাদ্যমূল্য কিছুটা হলেও সহ্য করার মতো হয়েছে ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থপ্রবাহের জন্য, যা জনগণের ন্যূনতম কেনাকাটার ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে।
নিউ ওয়েলফেয়ারিজম একটি অতিরঞ্জিত মার্ক্সবাদী সূত্রকে জনগণের কাছে নতুন আফিম হিসেবে স্থাপন করতে পারে। আরো সংযতভাবে বললে নিউ ওয়েলফেয়ারিজম অর্থনৈতিক উৎসাহের একটি অংশ হিসেবে যাত্রা করলেও এখন সেটি প্রশান্তিদায়ক মলম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
অরবিন্দ সুব্রামানিয়াম: ব্রাউন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো এবং সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের নন রেসিডেন্ট ফেলো, অব কাউন্সেল: দ্য চ্যালেঞ্জস অব দ্য মোদি-জেটলি ইকোনমি (ইন্ডিয়া ভাইকিং, ২০১৮)-এর লেখক
জোস ফেলম্যান: জেএইচ কনসাল্টিংয়ের প্রিন্সিপাল
ভাষান্তর: মো. আবিদ মঈন খান










