দেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে জলাবদ্ধতা। গত সাত মাসে ১০ বারের মতো পানিতে ডুবেছে মহানগরীটি। এর আগের বছর এক ডজনবার পানিতে ডুবেছিল চট্টগ্রাম। এবারের ভোগান্তি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। ভারি বর্ষণ ও পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ারে রোববার টানা তৃতীয় দিনের মতো পানিতে ডুবেছে বাণিজ্যিক রাজধানীটি। তিনদিনের জলাবদ্ধতায় বন্দরনগরীর অন্তত ৪০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ১০-১২ ঘণ্টার মতো পানিতে ডুবে থাকায় অসহনীয় কষ্টের শিকার হয়েছে নগরীর অন্তত ১৫ লাখ বাসিন্দা। প্রতি বছর একটু বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা ও পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলেও নগর কর্তৃপক্ষ একে অন্যের কাঁধে দোষ চাপানোয় ব্যস্ত।
গতকাল বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬-১০ বছর আগে নেয়া হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার চার প্রকল্প। তবে কাজের ধীরগতি ও দীর্ঘসূত্রতায় কোনো সুফলই পায়নি চট্টগ্রামবাসী। উল্টো সেই ব্যয় বেড়ে ১৪ হাজার ২৬৩ কোটি টাকায় উঠেছে। পাশাপাশি আগে যেখানে বৃষ্টি হলে জমত হাঁটুজল, এখন কোমর; কোথাও কোথাও আবার জমছে বুকসমান পানি। নগরীর প্রধান এ সংকটের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) একে অন্যকে দোষারোপ করে আসছে। সংস্থা দুটির মধ্যে সমন্বয় না থাকায় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও জটিলতায় পড়েছে বাস্তবায়নকারী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কয়েকদিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ এলাকাই বুকসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজার, পাহাড়তলী বাজার ছাড়াও নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো প্রতিদিন বড় একটি সময় পানির নিচে থাকছে। অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষ পড়ছে বিপাকে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও মানুষের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যও থমকে রয়েছে কয়েকদিন ধরে।
এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মহানগরীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী (কলেজ ও প্রশাসন উইং) বলেন, ‘শুধু মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) চট্টগ্রাম মহানগরীর সরকারি ও বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। অবস্থা উন্নতি সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
এদিকে অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস পরীক্ষা ১০ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস খোলা থাকবে। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে বন্ধ রয়েছে চবির শাটল ট্রেন পরিষেবা। স্থগিত করা হয়েছে চার বিভাগের পরীক্ষা। স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির তো শেষ নেই। প্রতি বছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হলেও নগর কর্তৃপক্ষ যেন ঘুমিয়ে। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে তাদের হাত যেন অদৃশ্য কোনো সুতায় বাঁধা।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে সিডিএ। ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পটি ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকে অনুমোদন হয়। ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকার এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। তিন দফায় সময় বাড়িয়ে সেটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব দিয়েছে সিডিএ। এরই মধ্যে ব্যয় বেড়ে সর্বশেষ সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত ডিপিপি প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। সর্বশেষ মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ ৭৭ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। তবে এ প্রকল্পের অধীনে নগরীর প্রধান বেশ কয়েকটি সড়ক উঁচু করা হলেও অলিগলিসহ বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় সংকট এখন চরমে।
বন্দরনগরীর জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কোনো দায় নেই—বেশির ভাগ সময় এমন কথা শোনা যায় মেয়র কিংবা সংস্থাটির দায়িত্বশীলদের মুখে। তাদের অভিযোগের তীর চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দিকে। নগর কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সিডিএ তাদের প্রকল্পের আওতাধীন খালগুলো থেকে যে পরিমাণ মাটি (সাড়ে ৯ লাখ ঘনমিটার) উত্তোলনের কথা, তার চার ভাগের এক ভাগও তোলেনি। রাস্তা করার জন্য খালের প্রশস্ততা কমিয়েছে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মাটি উত্তোলন না করায় খালের গভীরতাও কমেছে। তাতে পানিপ্রবাহের পরিমাণ কমে গেছে। এছাড়া জলকপাটগুলো এখনো চালু হয়নি। পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা করেনি। এসব কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। সিডিএর কর্তাব্যক্তিদের কাছে জানতে চাইলে তারাও আঙুল তোলেন চসিক কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দিকে। তাদের প্রকল্পের আওতায় খালগুলো ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে বলে দাবি সিডিএর। কিন্তু সিটি করপোরেশন নালাগুলো পরিষ্কার করেনি। যার কারণে নালা থেকে খালে পানি নামতে পারছে না। এতে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে নিজেদের দায় কিছুটা কমলেও নগরবাসীর ভোগান্তি লাঘব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ভয়াবহ জলাবদ্ধতার পেছনে দুটি কারণ; এক. খালগুলো পরিষ্কার নয়, দুই. নদী ও সাগরে জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধিতে নামতে পারেনি খালের পানি। সিডিএ ও চসিকের ধাক্কাধাক্কিতে খাল ও নালা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হয়নি। গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলার কারণে বৃষ্টির পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা জলাবদ্ধতা নিরসনে এত বড় অংকের প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও কেন তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি, নগরবাসীর দুর্দশা কাটেনি তার কারণ অনুসন্ধান জরুরি। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ঠিকমতো কর্মসূচি হাতে নিতে পেরেছে কিনা, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কিনা, সঠিক নকশা প্রণয়ন করেছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নকশায় ত্রুটি থাকলে তা দূর করে প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে চসিক, সিডিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয় কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সে ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। কর্তাব্যক্তিদের ইগো সুরক্ষার চেয়ে জানমালের সুরক্ষা দেয়া সরকারের প্রধান কাজ। চট্টগ্রামে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তা নিশ্চিতে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নগরবাসীর দুর্দশা দূর করতে কর্তাব্যক্তিদের যেন শুভবুদ্ধির উদয় হয় এবং একে অন্যের দিকে আঙুল না তুলে হাতে হাত রেখে জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধান করবে এবং তা নিরসনে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে—এ কামনা করছি।










