একেকটি অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভবনধসের মতো দুর্ঘটনার পর ‘অনুমোদন ছিল না, নোটিস দিয়েছি’র কাঁধে বন্দুক রেখে নিজস্ব দায় এড়িয়ে যাওয়া এক ধরনের প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভবন নির্মাণসংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের। কিন্তু এ দায়সারা গোছের কথাবার্তার মধ্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঁকি দেয়—অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও একটি অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ হয় কীভাবে? গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের শহরাঞ্চলের নির্মাণ করা ও নির্মাণাধীন ৬৬ শতাংশ ভবনই অনিয়মে তৈরি হচ্ছে বা হয়েছে। ফলে ওইসব ভবনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়ে যায়। একই সঙ্গে ভবনগুলো অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি বেইলি রোডে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিও নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ হয়েছিল। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবনটিতে দোকান-রেস্তোরাঁ করার অনুমোদন ছিল না বলে জানিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। 

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বেশি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে রাজউকের অধিভুক্ত এলাকায়। ২০২১ সালের নভেম্বরে রাজউকের ২ হাজার ৫৯টি ভবনে অভিযান পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ২৪২টি ছিল নির্মিত ভবন। বাকি ১ হাজার ৬১৬টি ভবন নির্মাণাধীন। নির্মাণ হয়ে যাওয়া ২৪২টি ভবনের ১৫৯টিতেই ঘটেছে নিয়মের ব্যত্যয়। অন্যদিকে নির্মাণাধীন ১ হাজার ১৮০টি ভবনেও নিয়মের ব্যত্যয় পেয়েছে রাজউকের পরিদর্শক দল। এর মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৫৭টি ভবন। বাকি ১ হাজার ৪৪টি ভবনের মালিককে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। নগরবিদরা বলছেন, রাজধানীতে ভবন নির্মাণের অনিয়ম ও দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য রাজউকের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না।

জানা যায়, ঢাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের উচ্চতা ও ভবন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ঘটে থাকে। অর্থাৎ নকশায় যত তলা ভবন তৈরির উল্লেখ থাকে, তার চেয়ে বেশি তলার ভবন নির্মাণ হয় এবং আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ভবন তৈরি হয় কিংবা গড়ে তোলা হয় হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ড ঘটার আশঙ্কা থাকে। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাতে ২৮১ জন আহত ও ১০২ জন নিহত হয়েছে। অগ্নিকাণ্ড দেশজুড়ে ঘটলেও প্রতি বছর নিয়ম করে ঢাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেখা যাচ্ছে। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, ইউনাইটেড হাসপাতাল, চকবাজারে রেস্তোরাঁয়, বঙ্গবাজার, নিউমার্কেটসহ সম্প্রতি বেইলি রোড ভয়াল অগ্নিকাণ্ডের শিকার। এর প্রধান কারণ হলো রাজধানী ঢাকা মানুষের চাপে পিষ্ট হয়ে পড়েছে। স্থান সংকুলানে হিমশিম খাচ্ছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে গেছে। পাশাপাশি নগর পরিকল্পনায় রয়েছে তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতি।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভবন অনুমোদন ও নির্মাণ তদারকির দায়িত্বে আছে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি), কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, বিস্ফোরক অধিদপ্তর। প্রতিটি দুর্ঘটনা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। 

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-২০০৬ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুসারে, ভবন ব্যবহারের আগে বসবাস বা ব্যবহার সনদ (অকুপেন্সি সার্টিফিকেট) নেয়া আবশ্যক। কিন্তু ভবন মালিকরা অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেয়ার আগেই গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সংযোগ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করে ফেলেন। ফলে আইনের বাস্তবায়ন তো হয় না, বরং যেমন খুশি তেমন সাজো খেলার মতো মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় ভবন নির্মাণ হয়। ভবনে কোনো অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ির ব্যবস্থা থাকে না। নগর পরিকল্পনায় কোনো ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন হয় না। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসকে এবং হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা যায় না। ২০১৫ সালের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন ও তদারকির জন্য বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি গঠনের কথা থাকলেও গত আট বছরে তা গঠন করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে ঢাকায় রাজউক অনুমোদন দেয় স্থাপত্য নকশা দেখে। কাঠামোগত নকশা (স্ট্রাকচারাল ডিজাইন) যা ভবনের সক্ষমতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয়, সে ডিজাইন দেখার কোনো বাধ্যবাধকতা রাজউকের নেই। কাঠামোগত নকশা মূলত সার্টিফায়েড ইঞ্জিনিয়াররা করে থাকেন। নকশায় তাদের আইডি নম্বর থাকে, নাম-ঠিকানা থাকে। তারা ঠিকমতো ডিজাইন করেন কিনা এটি দেখার দায়িত্বে থাকে ইঞ্জিনিয়ারদের সমিতি আইইবি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণে আইইবিরও দায় সমপরিমাণ। কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে ভবন কাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর তা ভবন নির্মাণের আগেই নিশ্চিত করা জরুরি ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে। এখানেও তদারকির শিথিলতা রয়েছে। 

ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম অপরিকল্পিত ও বসবাসের অযোগ্য শহর হয়ে উঠেছে। এখানে পরিকল্পিত নগরায়ণের সুযোগ ক্রমেই কমছে। যেসব প্রকল্প চলমান কিংবা সম্পন্ন হয়েছে তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে অবশিষ্ট কিছু থাকবে না। এর জন্য প্রতিটি সংস্থার তদারকি জোরদারে সক্রিয় হওয়া দরকার এবং প্রয়োজনীয় অভিযানের ব্যবস্থা নেয়া উচিত, যেন অন্যায়ের শিকড় খুঁজে বের করা যায়। এরপর ভবনের মালিক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং দুর্নীতি দমন কমিশন এ বিষয়ে তৎপর হতে পারে। দুর্নীতি উদ্ঘাটিত না হলে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধ করা বেশ দুঃসাধ্য একটি কাজ হয়ে দাঁড়াবে।