চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ পেয়েছে। দেশে গুণগত শিক্ষার অভাব কতটা প্রকট হয়েছে তার চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে এবারের ফলাফলে। একই সঙ্গে দেশে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাল দশার চিত্রও তুলে ধরেছে।

এবারের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৩। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮। সে হিসাবে আগের বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ১৮ দশমিক ৯৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। আবার বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের পর এবারই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার সর্বনিম্ন। এছাড়া ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থীই ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছেন। এর বাইরে এবার বেশিসংখ্যক অকৃতকার্য হয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে (আইসিটি)। এর আগের বছর সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছিল ইংরেজিতে। এ থেকে একটি বিষয় ধারণা করা যায়, শিক্ষার্থীরা আবশ্যিক বিষয়গুলোয় পাস করতে পারছেন না। আরো আশঙ্কার বিষয় হলো, একজন শিক্ষার্থীও পাস করেননি এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবার রেকর্ড সর্বোচ্চ ২০২ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি।

এ পরিস্থিতির পেছনে বহুমুখী কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত যে দুর্বল তা অস্বীকার করা যায় না। উচ্চশিক্ষার ভিত গড়ে ওঠে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে। মৌলিক শিক্ষার আধার এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এ পর্যায়ে যদি শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয় ভালোভাবে আয়ত্ত করতে না পারে, স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ মাধ্যমিকে সে বিষয়ে তারা পিছিয়ে থাকবে। দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার অভাব ও শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অদক্ষ শিক্ষক দিয়ে পাঠদানে শিক্ষার্থীদের ভিত্তি দুর্বলই রয়ে গেছে। ২০২৩ সালের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ শিশু গণিতে একক অংকবিশিষ্ট সংখ্যা শনাক্ত করতে পারে না। এ জরিপে আরো দেখা গেছে, ইংরেজিতে ছেলেশিশুর মধ্যে ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং মেয়েশিশুর মধ্যে ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ইংরেজি বইয়ের একটি বর্ণও পড়তে পারে না।

অন্যদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মূল সংকট হয়ে উঠেছে শিক্ষকের অভাব। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ১০ হাজার ৯০০ শিক্ষক পদ রয়েছে। এর মধ্যে সহকারী শিক্ষকের পদ ৫ হাজার ৪৫২। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ২ হাজার ৭১০ জন। পদ শূন্য আছে ২ হাজার ৭৪২। ফলে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাতের ব্যবধান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে বেড়ে গেছে, যা পাঠদানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিক সংস্কার না হওয়া, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, বিদ্যমান পাঠ্যক্রম—সব মিলিয়ে শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। আবার পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর পড়াশোনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, যা বাস্তব জীবনের জ্ঞান অর্জনে সহায়ক নয়। এর পাশাপাশি শ্রেণীকক্ষে অনিয়মিত পাঠদান এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার অভাবও মান অবনতির বড় কারণ বলে মনে করেন তারা। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সে দেখা গেছে, দেশে একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে শ্রেণীতে যা শিখছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীর দক্ষতার সমান। অর্থাৎ অবকাঠামোগত ঘাটতি, শিক্ষক সংকট ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতাও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েরই শেখার আগ্রহ ও সৃজনশীল চিন্তার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

তবে এবারের নিম্নমুখী ফলাফলের পেছনে কিছু সাম্প্রতিক ঘটনাবলিরও দায় রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি উদাসীনতাও তৈরি করেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নানা প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেয়া, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে শিশুকাল থেকে শিক্ষাকে সহজীকরণের প্রবণতা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা অর্জনের পথে অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলো। গত চার বছরে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৯৫ দশমিক ৫৭, ৮৪ দশমিক ৩১, ৭৮ দশমিক ৬৪ ও ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অবশ্য শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের অনেকেই এও বলছেন যে বিগত বছরগুলোয় সরকারের পক্ষ থেকে পাসের হার বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য নম্বরের তুলনায় অধিক নম্বর দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হতো। এতে পাসের হার ও জিপিএ ৫ উভয়ই বেশি ছিল। তবে গত বছর বা এবার সরকারের পক্ষ থেকে প্রকৃত মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়ায় পাসের হার ও জিপিএ ৫ উভয়ই কমেছে। সে প্রেক্ষাপটেও বলতে হয় এবারের ফলাফল শিক্ষার গুণগত মানের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেছে।

এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটাতে প্রয়োজন বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া—আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োজন, উপযুক্ত শিক্ষাদানসামগ্রী ও ভৌত অবকাঠামো প্রস্তুত, যথার্থ শিক্ষণ-শিখন/পদ্ধতি আবিষ্কার, উপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি বিশ্লেষণ, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং ইত্যাদি। এসব কাজ করতে আবার প্রয়োজন অর্থায়ন। কিন্তু জিডিপির বিপরীতে দেশে শিক্ষা খাতের বরাদ্দও অতি সামান্য। সুতরাং শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। এ বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে দক্ষ শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি, পাঠ্যক্রম ও শিখন-শেখানোর পদ্ধতির উন্নয়ন। আর এর শুরুটা হতে হবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর থেকে। কেননা শিক্ষার ভিত মজবুত না হলে উচ্চ শিক্ষায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। উচ্চ শিক্ষার মান না বাড়লে তা কখনই টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়ক হবে না। এমনিতেও উচ্চশিক্ষা স্তরেও নানা সমস্যা বিদ্যমান। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সরকারের সর্বস্তরে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন।