সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কফির দাম ফুলেফেঁপে উঠেছে। ব্রাজিল, ভারত, ভিয়েতনামের মতো প্রধান কফি উৎপাদনকারী দেশে প্রতিকূল আবহাওয়া ও সরবরাহ সংকটের কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যদিও গ্রাহকরা এক কাপ কফি পান করতে বেশি পয়সা খরচ করছেন কিন্তু কফি চাষীরা তা থেকে সামান্যই লাভ পাচ্ছেন। দরকষাকষির পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকার কারণে বর্ধিত দামের সুবিধা ঘরে তুলতে পারছেন না কফি চাষীরা।
১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে এখনো বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রীত পণ্যগুলোর মধ্যে আছে কফি। একসময় তেলের পর পরই সবচেয়ে বিক্রীত পণ্য ছিল এ পানীয়। অনেক দেশের সরকার তো কফিকে কৌশলগত পণ্য হিসেবেও বিবেচনা করে। এদিক থেকে এগিয়ে থাকার ক্ষেত্রে কফিকে অন্যতম পণ্য হিসেবে বিবেচনা করেন কিন্তু সব কফি ব্যবসা সমানতালে একইভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো অপেক্ষাকৃত কম মানসম্পন্ন অপ্রক্রিয়াজাত কফি, কাঁচা মটরশুঁটি এবং শুকনো বীজহীন কফি রফতানি করে—যেখানে ব্রাজিল, কলাম্বিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়া সম্মিলিত কফি বাজারের শেয়ারের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আবার গ্লোবাল নর্থের দেশগুলো ভালো মানের প্রক্রিয়াজাত কফি, যেমন রোস্টেড বিন এবং ‘ইনস্ট্যান্ট’ কফির রফতানিতে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। এক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোর নাম চলে আসে; যারা বাজারের ৭০ শতাংশ রফতানি নিজেদের দখলে রেখেছে৷। অধিকন্তু কফি সেক্টরে মাত্র তিনটি উন্নত দেশের সংস্থার আধিপত্য রয়েছে—নেসলে, স্টারবাকস ও জেডিই পিট। এই তিনটি কোম্পানিই মূলত কফি সেক্টরের দশটি বৃহত্তম সংস্থার সম্মিলিত রাজস্বের ৭৭.৭ শতাংশ একত্র করতে সক্ষম!
প্রক্রিয়াজাত কফির দাম অপ্রক্রিয়াজাত কফির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলা চলে (গড়ে প্রতি কেজি ১৪.৩০ ডলার বনাম ২.৪০ ডলার)। প্রকৃতপক্ষে গ্লোবাল সাউথের কফি উৎপাদনকারীরা বাজারের মূল্যের একটি ছোট এবং ক্রমহ্রাসমান অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে ১৯৯২ সালে কফি উৎপাদক দেশগুলো কফি রফতানি করে বাজারমূল্যের এক-তৃতীয়াংশ দখল করেছিল; ২০০২ সালের মধ্যে তারাই ১০ শতাংশেরও কম বাজারমূল্যের রফতানীকৃত কফি তাদের দখলে আনতে পেরেছিল। কফি চাষীরা নিজেরাই এক কাপ কফির জন্য চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ১ শতাংশ বা আরো কম পেয়ে থাকেন। তারা গ্লোবাল নর্থের ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করা কফি প্যাকেজের জন্য ধার্য করা মূল্যের প্রায় ৬ শতাংশ পান।
গ্লোবাল সাউথের কফি উৎপাদকদের জন্য সুস্পষ্ট সমাধান হবে—তাদের রফতানি মূল্য সংযোজন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো। কিন্তু এ ধারায় অগ্রগতি অব্যাহত রাখার পথে প্রবল বাধা রয়েছে! উন্নত দেশগুলো প্রক্রিয়াজাত কফি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৭.৫-৯ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০-১৫ শতাংশ এবং জাপানে ২০ শতাংশ করে শুল্ক আরোপ করে থাকে। এক্ষেত্রে আবার প্রক্রিয়াবিহীন বা অপ্রক্রিয়াজাত কফিতে শুল্ক ধার্য করা হয় না।
অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলো শুল্ক আরোপ করার সময় প্রক্রিয়াকৃত এবং অপ্রক্রিয়াজাত কফির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে চায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ব্রাজিলে উভয় ধরনের কফির আমদানিই ১০ শতাংশ শুল্কসাপেক্ষে বিবেচ্য। সুতরাং যখন উন্নত দেশের নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষীয় ব্যাংক এবং গবেষণা সংস্থাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের রফতানি মূল্য সংযোজন করার পরামর্শ দিচ্ছে, তখন উন্নত দেশগুলোর বাণিজ্য নীতি তাদের তা করতে নিরুৎসাহিত করছে।
উন্নত দেশগুলোর সরকার দৃশ্যত তাদের শুল্ক ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে অনিচ্ছুক। অতএব উন্নয়নশীল দেশের সরকারদের তাদের প্রতিহত করার জন্য আর্থিক প্রণোদনার ওপর নির্ভর করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, তারা প্রক্রিয়াকৃত কফি রফতানিতে ভর্তুকি দিতে পারে এবং প্রক্রিয়াবিহীন কফির ওপর রফতানি শুল্ক আরোপ করতে পারে। মালয়েশিয়া পাম তেলের বিষয়ে অনুরূপ পদক্ষেপ নিয়েছিল: যুক্তরাজ্য প্রক্রিয়াজাত পাম তেল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করার পরে মালয়েশিয়া প্রক্রিয়াজাত পাম তেলের ওপর কর কমিয়েছে এবং অপরিশোধিত পাম তেল রফতানিতে রফতানি কর চালু করেছে।
গ্লোবাল সাউথের প্রক্রিয়াকৃত কফির সম্ভাব্য রফতানিকারকরাও অশুল্ক বা প্রযুক্তিগত বাধার সম্মুখীন হবেন, যেমন স্যানিটারি এবং ফাইটোস্যানিটারি নিয়মগুলো এ আওতায় পড়ে। এ বিষয়গুলো অবশ্যই সম্পূর্ণরূপে ন্যায়সংগত, তবে তা কাটিয়ে উঠতে এ দক্ষিণ ভাগের রফতানিকারকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এছাড়া রোপণ ও প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির বিকাশের স্বার্থেও এ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত ও সামাজিক মান পূরণ করার বিষয়াদি মাথায় রেখে বিনিয়োগ করার কথা ভাবতে হবে।
গ্লোবাল সাউথের রফতানিকারকরা চাইলে উত্তরের ভোক্তাদের কাছে উৎপাদিত ব্র্যান্ডেড কফি সরাসরি বিক্রি ও রফতানি করতে পারে। সর্বোপরি, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন হলো সর্বোচ্চ মূল্য সংযোজন করার মতো একটা জায়গা৷যেখানে সমস্যা তৈরি হয় যখন বাজারে ভোক্তা প্রবেশের বাধাগুলো খুব তীব্র হয়, তখন একটি নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করতে যথেষ্ট সম্পদ এবং ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতা থাকতে হয়।
একমুখী সংস্থাগুলো ওই বাধাগুলোর মধ্যে কয়েকটিকে অতিক্রম করতে পারে, যা বিদ্যমান ব্র্যান্ডগুলোকে দখলে নেয়ার পদক্ষেপ হতে পারে। এ প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়া যায়—তারা লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বিদ্যমান ব্রিটিশ পাম অয়েল সংস্থাগুলোর প্রতিকূল বা বিপজ্জনক হস্তান্তর ঘটিয়েছে; অর্থাৎ সংস্থাগুলোকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও নিজেদের আওতায় এনেছে৷। প্রকৃতপক্ষে কেবল চায়নাই নয়, বরং এ ধরনের আন্তর্জাতিক অধিগ্রহণ বাজারের অন্যান্য ‘লেট কামার’ দেশগুলোর জন্য একটি প্রয়োজনীয় কৌশল হিসেবে কাজ করে থাকে।
গ্লোবাল সাউথের উৎপাদকদের কাছে আরেকটি বিকল্প উপায় রয়েছে: তারা একটি ওপেক স্টাইলের কফি ‘কার্টেল’ তৈরি করতে পারে, যা গ্লোবাল নর্থের তুলনায় দাম ও শুল্কের বিষয়ে অনেক বেশি দরকষাকষির ক্ষমতা রাখতে পারবে। এ পদ্ধতি রেডিক্যাল মনে হলেও বাস্তবসম্মত বলা চলে, কারণ গ্লোবাল সাউথের শীর্ষ দশ কফি উৎপাদনকারীরা বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আবার পদ্ধতিটি ন্যায়সংগতও হবে, কারণ তখন কার্টেলটি যে সাপ্লাই-সাইড’ অলিগোপলির প্রতিনিধিত্ব করবে তা বিদ্যমান ‘ডিমান্ড-সাইড বা রোস্টার’ অলিগোপলিকে মোকাবেলার উদ্দেশ্যেই বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হবে।
প্রথমত, গ্লোবাল সাউথের কফি সেক্টরকে একত্র করতে হবে, যেখানে ছোট সংস্থাগুলোকে একীভূতকরণ এবং অধিগ্রহণের মাধ্যমে এক ছাদের নিচে আনা সম্ভব হবে। নতুন বড় কোম্পানিগুলো সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে রফতানি করা কফির মান উন্নত এবং পরিবর্তন করতে সহায়তা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ‘ফেডারেশন ন্যাসিওনাল ডি ক্যাফেটেরোস ডি কলম্বিয়া নামক সংস্থা কলম্বিয়ান ফ্রিজ-ড্রাই কফি উৎপাদক’ বুয়েনক্যাফের সঙ্গে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ান পাম অয়েল বোর্ড মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী কফি বাজারের অসামঞ্জস্যগুলো অবশ্যই বহুপক্ষীয় ফোরাম যেমন জাতিসংঘ বা জি২০-তে সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু যতদিন উন্নত দেশগুলো সক্রিয়ভাবে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচ্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর কফি থেকে অর্থোপার্জনের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে চলবে, ততদিন গ্লোবাল সাউথের উৎপাদকদের নিজের হাতে বিষয়গুলো তুলে নেয়া ছাড়া উন্নয়নের আর বিকল্প কোনো পথ থাকবে না। শুল্ক, ভর্তুকি, বিপজ্জনক টেকওভার, এমনকি একটি কফি কার্টেল গঠন করার আলোচনা আলাপচারিতায় তুলে আনা প্রয়োজন।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কিয়ুন লি: দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইন্টারন্যাশনাল শুম্পেটার সোসাইটির সাবেক প্রেসিডেন্ট, সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক, ২০১৪ শুম্পেটার পুরস্কার বিজয়ী এবং ‘চীনের টেকনোলজিক্যাল লিপফ্রগিং অ্যান্ড ইকোনমিক ক্যাচ-আপ: এ শুম্পেটেরিয়ান পারস্পেকটিভ’-এর লেখক
ভাষান্তর: নূসান্তা সামায়েল অদ্রি










