আমি অর্থনীতিবিদ নই, একজন রাজনৈতিক কর্মী। এ অনুষ্ঠানে আসার পথে আমার এক সহকর্মী আমাকে মনে করিয়ে দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আলবার্ট হার্শম্যানের কথা। তিনি ১৯৫৮ সালে ‘দ্য স্ট্র্যাটেজি অব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেন। ওই সময় থেকে এ বই অর্থনীতিতে ক্ল্যাসিক বই হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ বইয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘উন্নয়ন অনেকটা প্রচ্ছন্ন সম্পদ আবিষ্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত। সমাজে এমন অনেক সম্পদ আছে যা দৃষ্টির অগোচরে, সুপ্তাবস্থায় রয়েছে। সেগুলোর আবিষ্কার উন্নয়নে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। আর তাই সরকারের উচিত সম্পদ অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের জন্য যথাযথ কৌশল অবলম্বন করা।’ বাংলাদেশে ঠিক এমনটাই ঘটেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন সোনার বাংলা বিনির্মাণ করতে, যেখানে মানুষ স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং সমৃদ্ধির সঙ্গে বাস করবে। জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক খাতে উল্লেখযোগ্য হারে অগ্রগতি সাধন করেছেন অনেক সুপ্ত সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মধ্যেও অব্যাহত প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের শক্তিশালী ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশের। আমাদের জনশক্তি, শক্তিশালী রফতানি, রেমিট্যান্সের স্বাভাবিক প্রবাহ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা গত এক দশকের দ্রুতগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে, শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটবে। দেশে দারিদ্র্যের হার যে কমেছে তা বিভিন্ন প্যানেল বক্তার কথাতেও উঠে এসেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বর্তমান সরকার পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকা মেট্রোরেলের মতো বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য হারে অগ্রগতি সাধন হয়েছে। এছাড়া প্রজেক্টগুলো দেশের জিডিপিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। কভিড-১৯, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি লাভ করেছে।

দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে। এক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিকের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর একটি যুগান্তকারী প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদে মানুষের অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এই কমিউনিটি ক্লিনিকের উদ্যোগটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রচেষ্টাটি অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ায় এটা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় জতিসংঘ দ্বারা স্বীকৃতি পেয়েছে। বহির্বিশ্বে এটা ‘‌‌শেখ হাসিনা ইনিশিয়েটিভ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং সমতা নিশ্চিতের এ উদ্যোগ মানুষের প্রতি শেখ হাসিনার দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেট গ্রহণ করা হয়, যেখানে নারীর উন্নয়নে ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। একজন বক্তা তার আলোচনায় দারিদ্র্য হারের মধ্যে অসংগতি, নারী সদস্য দ্বারা পরিচালিত পরিবারগুলোয় তুলনামূলক স্বল্প দারিদ্র্য কেন সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ প্রশ্নের উত্তর নিহিত আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে, যার আওতায় তাদের ভাতা প্রদান করা হয়। পরিবারের বয়স্ক, প্রতিবন্ধী (বিশেষভাবে সক্ষম) ও বিধবাদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা হয়। 

সফলভাবে ‘‌ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি স্মার্ট জাতিতে রূপান্তরের স্বপ্ন নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য হচ্ছে নিরলসভাবে কাজ করে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়ন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা। একটি সাশ্রয়ী, টেকসই, বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবনী স্মার্ট বাংলাদেশ চারটি স্তম্ভের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। সেগুলো হলো: স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট ইকোনমি এবং স্মার্ট সোসাইটি। আমরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের নতুন মাইলফলকে পৌঁছেছি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা গত বছর আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছি, সেটা হচ্ছে সর্বজনীন পেনশন স্কিম। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উন্নয়নের পথ নির্দেশিকা রয়েছে। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, জ্বালানি স্বল্পতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বিভিন্ন কর্মপন্থা হাতে নিয়েছে, সেগুলো বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

একই সঙ্গে দেশের নাগরিকদের জন্য, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এতে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। এছাড়া মানবসম্পদ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস করতে ক্ষুদ্র ঋণ, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সহায়তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে টার্গেট করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে টেকসই পরিবেশ ও সহনশীল জলবায়ুর ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত হওয়ার পরও বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে। এখানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সবুজায়নে বিনিয়োগ করা হয়েছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষায় ও জলবায়ু কৃষি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ দেশের উন্নতি ও জনগণের জীবন মান রক্ষায় গৃহীত। প্রতিকূল জলবায়ু এবং কাঠামোগত উন্নয়নের পথের বাধাবিপত্তি মোকাবেলায় জাতীয়ভাবে আমরা সক্রিয় আছি।

ওয়াসিকা আয়শা খান: অর্থ প্রতিমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

(দৈনিক বণিক বার্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের যৌথ আয়োজনে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রাখা আলোচনায়)

ভাষান্তর: সাবরিনা স্বর্ণা