কোনো দেশের বাজেট ব্যয় নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ উৎস ওই দেশের রাজস্ব আয়। রাজস্বপ্রবাহ মসৃণ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ দুর্নীতিমুক্ত হলে সরকারের ব্যয় নির্বাহ করা সহজতর হয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো যাতে সচল থাকে এজন্য সরকারের আয়ের উৎস নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্যসমাপ্ত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। যদিও এ সময় সংস্থাটির আহরণ হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকার কিছু বেশি। সে হিসাবে গত অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আহরণ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা কম।
উল্লেখ্য, শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর—প্রধানত এ তিন খাত থেকেই রাজস্ব আহরণ করে এনবিআর। গত অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ছিল শুল্ক খাতে। ঘাটতির দিক থেকে পরের অবস্থানে ছিল যথাক্রমে ভ্যাট এবং আয়কর ও ভ্রমণ। ডলার সংকটের কারণে গত অর্থবছরে পণ্য আমদানি ও এলসি খোলায় বেশ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বিষয়টি শুল্ক খাতে রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, খাতটি থেকে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গত অর্থবছরে আমদানি ও রফতানি পর্যায়ে শুল্ক হিসেবে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল এনবিআর। যদিও সংস্থাটির আয় হয়েছে ৯২ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় খাতটিতে রাজস্ব আহরণ ঘাটতি ১৮ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।
বণিক বার্তার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, শুল্ক খাতে রাজস্ব আহরণ কমার কারণ হিসেবে আমদানি ও এলসি খোলায় কড়াকড়িকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরাও। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিগগিরই শুল্ক খাত থেকে রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা তেমন একটা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৬ হাজার ৯৯৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের, যা ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময় ছিল ৮ হাজার ৯১৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। সে অনুযায়ী গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে ঋণপত্র খোলার হার কমেছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশের বেশি। ভ্যাট খাতে গত অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। এ সময় খাতটি থেকে রাজস্ব আহরণ হয়েছে লক্ষ্যের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম। তবে এ সময় ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ভ্যাট খাত থেকে এনবিআরের রাজস্ব আয় বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। সে অনুযায়ী ভ্যাট খাতে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে এনবিআরের আয়কর ও ভ্রমণ করে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকার বেশি। এ খাতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। আয় হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা।
বর্তমান বিশ্বে যেকোনো দেশের অর্থনীতি পরিচালনার জন্য দক্ষ সরকারি অর্থ ব্যবস্থা অপরিহার্য। একটি দেশের সরকারি অর্থ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ওই দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা তথা অর্থনৈতিক কল্যাণ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত সরকারি আয়-ব্যয় তথা সরকারি অর্থ ব্যবস্থার তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। তখন ভাবা হতো, যে সরকার অর্থনীতিতে কম ব্যয় করে কম আয় করে সে সরকারই উত্তম। সরকার অর্থনীতিতে যত কম হস্তক্ষেপ করবে ততই মঙ্গল। কিন্তু বর্তমানে এ ধারণা ভিন্ন। এখন অনেকটা বলা যায়, যে সরকার বেশি আয়-ব্যয় করে সেই সরকারই উন্নয়নবান্ধব। তাই পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই বর্তমানে ঘাটতি বাজেট করে থাকে; যেখানে সরকার আয়ের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি করে। এক্ষেত্রে দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকার প্রচুর ব্যয় করে থাকে। এসব খাতে সরকারি ব্যয় ছাড়া উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব।
নব্বইয়ের দশক থেকে দ্রুত বড় হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। কিন্তু তাল মিলিয়ে বাড়ছে না কর-জিডিপি অনুপাত, যা দুশ্চিন্তারও বিষয়। অর্থনীতির সঙ্গে রাজস্ব আহরণের সামঞ্জস্য না থাকায় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে নির্ভর করতে হচ্ছে দেশী-বিদেশী ঋণের ওপর। ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যোগদান করবে, লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। কিন্তু কর-জিডিপি অনুপাত রেখে এটি অর্জন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে অ্যাকশন প্ল্যান বা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। রাজস্বভিত্তি বাড়াতে হলে এতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।
করজাল বৃদ্ধি, কর সংগ্রহের গতি আনা, সব জেলা ও উপজেলায় রাজস্ব অফিস স্থাপন এবং কর জরিপ পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক সংস্কারের বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ব্যাপক বাড়লেও ২০১১ সালের পর রাজস্ব প্রশাসনে আর কোনো সংস্কার হয়নি। জনবল ও অফিস সংখ্যা বৃদ্ধি, তথা প্রশাসনিক সংস্কারে কয়েক বছর আগে প্রস্তাব প্রণীত হলেও এ প্রস্তাব সরকারের অনুমোদনের জন্য এখনো অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বিলম্বিত হচ্ছে, যা কাম্য নয়। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে না পারলে বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্ব অর্থনীতিতে শ্লথগতি ও দেশে চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কঠিন পরিস্থিতির ইঙ্গিতবাহক। এ অবস্থায় রাজস্ব আয়প্রবাহ মসৃণ করতে এনবিআরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এ প্রত্যাশা রইল।










