দেশে চিকিৎসা খাতের আকার বাড়লেও মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়া যেন সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে হরহামেশা সহজ-জটিল রোগ নিরাময়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে মানুষ। গন্তব্যের তালিকায় পছন্দনীয় শীর্ষস্থান হয়ে উঠেছে ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজারের আকার প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পরিমাণ এবং প্রতি বছর চিকিৎসা নিতে বহির্গমনকারী রোগীর সংখ্যা সাত লাখ। বছরে এ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য মাথাপিছু গড় ব্যয় ৩৫০ কোটি ডলার। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে সরকারি হিসাবমতে, দেশে জনপ্রতি চিকিৎসা ব্যয় গড়ে ৫৪ ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় ৫ হাজার ৯৯৪ টাকা। চিকিৎসা ব্যয়ে এমন বিস্তর ফারাক থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ কেন দেশের বাইরে যায় সেটি নিঃসন্দেহে আমলে নেয়ার বিষয়। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ঠিক কতসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যায়, তার প্রকৃত হিসাব নিরূপণ করা। তাহলে ‘কেন’ তারা যাচ্ছে এবং দেশে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় হবে তা স্পষ্ট হবে। আবার এর মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থপ্রবাহের স্বরূপ জানা সম্ভব।
কিন্তু এ হিসাব কষা বেশ দুরূহ কাজ। কেননা চিকিৎসা খাতের অধিকাংশ ব্যয় নিষ্পত্তি হয় নগদ লেনদেন কিংবা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, বিদেশে বাংলাদেশীদের চিকিৎসা ব্যয়ের দশমিক ১ শতাংশ তথ্যও নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশোধ হয়েছে ৩২ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা আরো কমে নেমে আসে ১৭ লাখ ডলারে। চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিদেশে স্বাস্থ্যসেবা বাবদ বাংলাদেশীরা ব্যয় করেছে ১০ লাখ ডলার। এ থেকে ধারণা করা যায়, বিদেশে চিকিৎসা গ্রহীতার সংখ্যা ও তাদের ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব গণনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়গুলোকে চিহ্নিত না করায় সিংহভাগ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়গুলোর কোনো হিসাব ব্যাংকের কাছে থাকে না। এছাড়া বিদেশে চিকিৎসা ভিসা ছাড়া অন্যান্য ভিসায় গিয়েও চিকিৎসা নিচ্ছেন বাংলাদেশীরা। কেননা অস্ত্রোপচারের জন্য কেবল চিকিৎসা ভিসা প্রয়োজন। আবার ব্যয়সংক্রান্ত অনুমোদনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া বেশ জটিল। মেডিকেল সুপারিশ, চিকিৎসার নানা নথিপত্র ইত্যাদি প্রদান সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন এড়িয়ে যায় তারা এবং ডলার সংগ্রহ করে থাকে কালোবাজার, মানি এক্সচেঞ্জার, অবৈধ হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে। ফলে অবৈধ পথে অর্থ লেনদেনের বাজার পরিধি বাড়ছে এবং শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে এর নেতিবাচক প্রভাব সরকারি ও বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। সুতরাং প্রকৃত হিসাব নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে অর্থের লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে তা সম্পাদন করা জরুরি। যেহেতু অনেকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা গ্রহণেও বিদেশে পাড়ি দেয়।
তবে চিকিৎসা ব্যয়সংক্রান্ত জটিলতা সমাধান করে বাইরে অর্থের প্রবাহচিত্র ফুটিয়ে তোলা সম্ভবপর তা নিশ্চিন্তে বলা যায় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে দেশে বেসরকারি হাসপাতাল ছিল ৩৮৪টি। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ গুণেরও বেশি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, জেলা বা জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা হাসপাতালসহ (ইউনিয়ন পর্যায় বাদে) বিভিন্ন পর্যায়ের হাসপাতাল রয়েছে ৬৪০টি। এর বাইরেও সরকারের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে দেশে নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যাই এখন ৭ হাজার ৮৫৪। দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট শয্যা সংখ্যা ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি। এর মধ্যে বেসরকারিতেই রয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার শয্যা। আর বেসরকারি রোগ নিরীক্ষা কেন্দ্র আছে প্রায় ১০ হাজার। ব্লাড ব্যাংক আছে ১৮০টি।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালের সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসার মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত। এর কারণ হিসেবে তারা দেখছেন দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের অনাস্থা, যা মানুষকে বিদেশমুখী করেছে। বলা হয়, আস্থা সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা রাখে চিকিৎসক। কিন্তু দেশে চিকিৎকদের অবহেলার নজির কম নয়। চিকিৎসকের আন্তরিকতার ঘাটতি, রোগীর নিজস্ব মতামতকে গ্রাহ্য না করা, ব্যবস্থাপত্র বুঝিয়ে না দেয়া এবং সামাজিক অবস্থানভেদে বৈষম্যমূলক আচরণ করার মতো বিষয়গুলোর কারণে রোগীদের চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থার সংকট দেখা গেছে। জানা যায়, এখানে বেশি করে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়া হয়। সুতরাং শুরুতেই ওষুধের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা জরুরি। ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বাজারজাত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া রোগ নির্ণয়ে নির্ভুল পরীক্ষা নিশ্চিত করাও এক্ষেত্রে জরুরি। আর ক্রমান্বয়ে সব বিশেষায়িত চিকিৎসার পরিপূর্ণ সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া চিকিৎসকদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। যেন তারা পেশাদারত্বে আগ্রহ হারিয়ে না ফেলেন। অবশ্য এমন দৃশ্য অধিকাংশ সময় সরকারি হাসপাতালে দেখা যায়।
অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বাণিজ্যিক মনোভাবের কারণে সেবা নিয়ে তাদের মধ্যে সতর্কতা কম। একই সঙ্গে ব্যয়বহুলও বটে। ফলে বিত্তবানরাও আস্থার সংকটে ভুগছেন। ফলে তারাও বিদেশে ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণে পা বাড়াচ্ছেন। ফলে চিকিৎসা খাতে আউট অব পকেট ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষে থাকা দেশগুলোর একটি এখন বাংলাদেশও। এখানকার রোগীদের মোট ব্যয়ের ৭৪ শতাংশ আউট অব পকেট পেমেন্ট।
যেসব দেশে রোগীরা চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, সে দেশগুলোয় চিকিৎসাসেবা উন্নত। বিপরীতে দেশেও এখন অনেক জটিল রোগের চিকিৎসার সুব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আস্থার সংকটের ফলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনাগ্রহ লক্ষণীয়। তাই আস্থা ফেরাতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এভাবে ক্রমবর্ধমান হারে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে থাকলে দেশের চিকিৎসা খাত অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। অথচ বিদেশে যা ব্যয় হয় তার কাছাকাছি পরিমাণ অর্থ যদি দেশে ব্যয় করা হয় তাহলে চিকিৎসা খাতের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটানো যেতে পারে।










