কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, শোষণ, হয়রানি, ইত্যাদি নিত্যদিনের বিষয়। বিশেষত যেসব দেশে শ্রমিকদের যূথবদ্ধ হওয়ার ও যৌথ দরকষাকষির সুযোগ কম, শ্রমবান্ধব কর্মপরিবেশ নেই, মজুরি কম, এমনকি ন্যায়বিচারও পাওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই, সেসব দেশে শ্রমিকদের অবস্থা বেশ নাজুক থাকে। মজুরি প্রদান নিয়ে হয়রানি, মজুরিবিহীন অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় কাজ করানো, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা মালিক পক্ষের রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়। বাংলাদেশের শ্রমিকদের অবস্থাও খুব বেশি সন্তোষজনক নয়। তাই দফায় দফায় শ্রমিক আন্দোলন কিংবা বহির্বিশ্বের চাপের মুখে পড়ে পরিবর্তিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’। সম্প্রতি শ্রম আইন সংস্কারের তাগাদা দিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে সে কথা। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আইএলওর ২৬ ধারা অনুযায়ী ৮১, ৮৭ ও ৯৮ সনদ অনুসরণ না করায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সুষ্ঠু সমাধানের নকশা তৈরি এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বলেছে সংস্থাটি। 

শ্রমিকদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আইএলওতে যোগদান করে এবং সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত ৩৬টি কনভেনশন অনুসমর্থন দিয়েছে। আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে অনুসমর্থন করলেও স্বাধীনভাবে ট্রেড ইউনিয়ন করা ও পছন্দমতো নেতা নির্বাচন এবং যৌথ দরকষাকষির অধিকার থেকে শ্রমিকরা এখনো বঞ্চিত। এছাড়া কনভেনশন ৮১ অনুযায়ী শ্রম পরিদর্শনের মাধ্যমে কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কাজের শর্তাবলি সম্পর্কিত (সময়, মজুরি, নিরাপত্তা, শিশু ও তরুণ নিয়োগ ইত্যাদি) আইনানুগ বিধিমালা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও সেটিরও কোনো কার্যকর প্রভাব নেই। ট্রেড ইউনিয়ন হলো শ্রমিকের ঐক্যবদ্ধ ও প্রাপ্য অধিকার আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এটি ছাড়া শ্রমিকরা অসহায়। এ কারণেই অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা আর স্বল্প মজুরিতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনের অবস্থা বেশ নাজুক। এ নাজুক দশা সারা বছর ধরে বহাল থাকে। তবে কেবল টের পাওয়া যায় প্রতি বছর ঈদের আগে কিংবা বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে। যেমনটি হয়েছিল রানা প্লাজা ধসের পর।

এখন দেশের অবস্থা ক্রমেই বদলাচ্ছে। এলডিসি বাণিজ্য সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৯ সাল থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক জোটে জিএসপি প্লাস মর্যাদা পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ। তবে এটি তখনই সম্ভব হবে যখন দেশ মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুশাসন—এ চার ক্ষেত্রে ৩২টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে। জিএসপি প্লাস মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শ্রম আইন সংশোধনের কার্যক্রম চলছে। এছাড়া ২০২১ সালে গৃহীত জাতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার শ্রম আইনে পরিবর্তন আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইএলওর মতে, ২৬ নং অনুচ্ছেদের অভিযোগের পর সংস্থাটির কাছে সরকার যে রোডম্যাপ জমা দিয়েছে তার সঙ্গে জাতীয় পরিকল্পনার সংযোগ রয়েছে। ওই রোডম্যাপের লক্ষ্য হলো—সংগঠনের স্বাধীনতা ও সম্মিলিত দরকষাকষির অধিকারসহ শ্রম অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের ভূমিকা উন্নত করা। 

দেশে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি না কমে বরং বেড়েই চলেছে। কর্মপরিবেশও হচ্ছে না শ্রমিকবান্ধব। এতে প্রতিদিনই সাধারণ শ্রমিকদের জীবনহানি হচ্ছে কিংবা আহত বা পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। বাংলাদেশ ওশি (অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট) ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে কর্মস্থলে হতাহত হয়েছেন ১ হাজার ১৯৫ জন শ্রমিক। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ৯৬৭ জন এবং আহত হয়েছেন ২২৮ জন। ২০২১ সালে কর্মক্ষেত্রে হতাহতের এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৯ জন। ২০২২ সালে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ২৪৬ জন শ্রমিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ৯৪৯ জন শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে মারা গেছেন ১৫২ জন এবং আহত হয়েছেন ৯৪ জন। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ৮১৫ জনের মৃত্যু এবং আহত হয়েছেন ১৩৪ জন। এ সেবামূলক খাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ওয়ার্কশপ, গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, হোটেল/রেস্টুরেন্ট, সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মী প্রভৃতি। সেবা খাতের পর রয়েছে কৃষি খাত। এ খাতে মোট ১৩৯ জন শ্রমিক হতাহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২৪ জন মারা গেছেন, আর ১৫ জন আহত হয়েছেন, যা মোট হতাহতের ১২ শতাংশ। পাশাপাশি শিশু শ্রমিককে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে দেখা মেলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি নগরীতে। দেশের ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, পাঁচ খাতে ৩৮ হাজার ৮ জন শিশু কাজ করছে, যার ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশই ছেলেশিশু। সবচেয়ে বেশি শিশু কাজ করে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে। শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই।

২০২৬ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন যাত্রায় একটি বড় মাইলফলক ছুঁতে যাচ্ছে। ২০২৬ সাল পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে অনেক বাণিজ্যিক সুবিধা হারাবে। তখন বৈশ্বিক বাজার প্রতিযোগিতার মানদণ্ডের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। সেজন্য শ্রম আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কারের নকশা ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২৬ ধারার অভিযোগকে কার্যকরভাবে সমাধান করতে হবে। কর্মসংস্থান, শ্রম অধিকার, ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমিকরা যে ন্যূনতম মজুরি পান, তা মানবিক জীবন যাপন করে শ্রমশক্তি পুনরুৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে যতটা আয় প্রয়োজন, তার তুলনায় অর্ধেক আয় করেন দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা। মহামারীর পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ—এ জোড়া ধাক্কায় দেশে পারিবারিক ব্যয় অনেক বেড়েছে, কিন্তু শ্রমিকদের আয় বাড়েনি। অথচ দেশে মূল্যস্ফীতি ও মূল্যস্তর ক্রম ঊর্ধ্বমুখী।

শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া উৎপাদনের গতি বাড়ানো কখনো সম্ভব নয়। উন্নত দেশে পরিণত হতে গেলে যথাযথ আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।