দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ আকর্ষণ বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে ৭১ শতাংশ জাপানি কোম্পানি সন্তুষ্ট নয়। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি হলে জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোগী হবে। গত বছরের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ জরিপে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন ৭৪টি কোম্পানি তাদের মতামত দিয়েছে। জরিপ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২৬ দশমিক ২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি বলেছে, বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশে তারা অসন্তুষ্ট। ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ জানিয়েছে, তারা কিছুটা অসন্তুষ্ট। ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি আছে এমন কোম্পানি ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ।

ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও জেট্রোর জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে থাকা জাপানি কোম্পানিগুলোর ৭১ দশমিক ৬০ শতাংশ আগামী এক-দুই বছরে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী। জাপানি ব্যবসায়ীদের এমন মনোভাবের ক্ষেত্রে এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া। তবে কিছুটা এগিয়ে আছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। জাপানি কোম্পানিগুলোর ৭২ শতাংশ ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায়। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যবসায় ঝুঁকির দিক বিবেচনায় সরকারি লাইসেন্স বা অনুমোদন, বিনিয়োগের অনুমতি, কর সম্পর্কিত বিষয় এবং ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে বলে জাপানি কোম্পানিগুলো মনে করে। 

জাপানি কোম্পানিগুলো ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অপছন্দের শীর্ষে রেখেছে দুটি ক্ষেত্রে। প্রথমটি ব্যবসার অনুমোদন ও সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি, দ্বিতীয়টি কর ব্যবস্থার অদক্ষতা। প্রায় ৮০ শতাংশ জাপানি কোম্পানি মনে করে, এ দেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আর ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ জাপানি কোম্পানি মনে করে, কর ব্যবস্থার অদক্ষতা ব্যবসার ক্ষেত্রে এ দেশে বড় বাধা। এছাড়া বিদেশী মূলধনের আইনি কাঠামো বা ভিত্তি তৈরি এবং বিদেশীদের ভিসা ও কাজের অনুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) প্রাপ্তির জটিলতাও বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। যদিও এ দুটি ক্ষেত্রে মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ।

জরিপে ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ কোথায় এবং কেন এগিয়ে রয়েছে। জবাবে জাপানি কোম্পানিগুলো চারটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পছন্দের তালিকায় রেখেছে। ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে সস্তা শ্রম, শ্রমিক ও কর্মচারীর সহজ প্রাপ্তি, বিশেষায়িত জনশক্তি ও প্রকৌশলীর সহজ প্রাপ্তি এবং বিদ্যমান বাজার। জরিপে ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ জাপানি কোম্পানি ‘সস্তা শ্রমের’ জন্য বাংলাদেশকে ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে শীর্ষে রেখেছে। 

গত বছর বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে জাপানিদের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল শুল্ক ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত জটিলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার দামের অস্থিরতা। ২০২১ সালে ছিল দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি ও মজুরি বৃদ্ধি। জরিপে অংশ নেয়া ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি বলেছে, প্রথম চ্যালেঞ্জ শুল্কায়ন ব্যবস্থার জটিলতা। আর ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ কোম্পানি বৈদেশিক মুদ্রার দামের অস্থিরতাকে ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে। 

সার্বিকভাবে জরিপে জানতে চাওয়া হয়, পণ্য উৎপাদন খরচ কোন দেশে কেমন। এর জবাবে দেখা যায়, জাপানে যে পণ্য উৎপাদনে খরচ ১০০-তে ১০০, সেখানে বাংলাদেশে সেই পণ্য উৎপাদনে খরচ ৬০ শতাংশের কম। বাংলাদেশের চেয়ে পণ্য উৎপাদনে খরচ কম পড়ে শুধু কম্বোডিয়া ও লাওসে।

বাংলাদেশের জন্য জাপানের কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে, সেগুলো দূরীভূত করার ক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশীদের কাজের অনুমতিপত্র বা ওয়ার্ক পারমিট যাতে তিনদিনের মধ্যে দেয়া যায় সে প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এছাড়া ভিয়েতনামের চেয়ে কম সময়ের মধ্যে যাতে ব্যবসাসংক্রান্ত সেবার অনুমোদন চূড়ান্ত করা যায়, সেই কাজও করছে বিডা। বাংলাদেশে এখনো কোম্পানি গঠনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক ধরনের কাগজপত্র চায়। সময় লাগে বেশি, খরচও অনেক দেশের তুলনায় অধিক। শুল্কায়ন জটিলতা কমাতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর বা এইও সুবিধা ব্যবহারের আহ্বানও জানানো হয়েছে। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকা মানেই বিদেশী বিনিয়োগ চলে এসেছে এমনটি নয়, বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রণোদনা দিতে হবে। এটিকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।

মোদ্দা কথা, নতুন একটি উদ্যোগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি আমাদের দেশে বিরাজ করে তা বিদেশীদের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান হলে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে না। এজন্য বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এটি শুধু জাপানিদের জন্য নয়, সব দেশের বিনিয়োগকারীর জন্যই প্রযোজ্য।