বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিতা এখনো অনেকটাই ওরাল ট্র্যাডিশন বা মৌখিক ধারার জ্ঞানপ্রথায় ভর করে চলে। অবশ্যই এমন বহু বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা নিয়ম মেনে রিসার্চ-মেথডলজি অনুসরণ করে জ্ঞান তৈরি করেন। কিন্তু এ ধরনের কাজের বড় অংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের ভেতরেই রয়ে যায়। পাবলিক স্পেস বা জনপরিসরে যেসব বুদ্ধিজীবী আমরা বেশি দেখি, তারা সবসময় একাডেমিক্যালি মানসম্পন্ন নাও হতে পারেন, তাদের হয়তো তেমন দরকারও নেই। কিন্তু জনমত তৈরি করতে তাদের প্রভাব অনেক বেশি। অনেকে নিজেদের থিংকার, রাইটার বলে পরিচয় দেন, স্থানীয় বাজারের জন্য কিছু বইও প্রকাশ করেন, তবু মানুষ তাদের লেখার চেয়ে কথাবার্তার জন্যই বেশি চেনে।

আমার মতে অরেটরি-ড্রিভেন কালচার অর্থাৎ বাগ্মিতা-নির্ভর সংস্কৃতি খুব খারাপ কিছু নয়। যেসব সমাজে মৌখিক ধারার জ্ঞানপ্রথা শক্তিশালী, সেখানে কথা বলাও জ্ঞানচর্চা ও ছড়ানোর একটি গ্রহণযোগ্য পথ। কিন্তু এতে একটি কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হয়। আল্যাঁ বাদিউর ভাষায় আমাদের ফিল্ড (ক্ষেত্র বা অঙ্গন) এমনভাবে সাজানো যে এখানে সিম্বলিক ক্যাপিটাল (প্রতীকী পুঁজি) গড়ে ওঠে একজন বুদ্ধিজীবী কতবার টিভি-শোতে অংশ নেন বা তার ক্লিপ কতটা ভাইরাল হয় তার ওপর। এর ফলে স্লো স্কলারশিপের কদর কমে। মিডিয়া লজিক সাধারণত তাড়াহুড়া, নাটকীয়তা ও ইমোশনকে মাথায় রেখে খবর বানায় ও প্রচার করে, সেখানে নুয়ান্সের আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলাফল হলো অ্যাটেনশন ইকোনমি তৈরি হয়, যা বুদ্ধিবৃত্তির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। এতে পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালরা মুহূর্তের কমন সেন্স, অর্থাৎ গ্রামশি যাকে হেজেমনি বলেছেন, তার সঙ্গে হাঁটতে ও গলা মেলাতে থাকেন, অসুবিধাজনক ও অজনপ্রিয় সত্য বলার প্রবণতা কমে যায়।

এভাবেই অনেক বুদ্ধিজীবী জনপ্রিয়তার দিকে ঝুঁকে পড়েন। লাইভ দর্শকের সামনে সীমিত সময়ের ভাষণে মানুষ যা শুনতে চায়, তাই তিনি বা তারা বলেন। তারা অ্যাজেন্ডা-সেটিং অর্থাৎ কোন বিষয় আলোচ্য হবে তা নির্ধারণ করেন এবং ফ্রেমিং অর্থাৎ কোনো ঘটনাকে কীভাবে দেখা বা বোঝানো হবে তা নির্মাণ করেন। এ প্রক্রিয়ায় জটিল বাস্তবতাকে তারা সহজ, সাদা-কালো কিছু বাক্সে বন্দি করে ফেলেন। এতে জনপ্রিয়তা দ্রুত আসে, মানুষ মনে করে এ বুদ্ধিজীবী তো আমার ভাষায় কথা বলছে। সে তো আমার লোক। নানা দলের অ্যাক্টিভিস্ট এমন বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা উৎসাহিত হন, অনেক ক্ষেত্রে পরামর্শও নেন, বুদ্ধিজীবীর ক্যারিয়ার গতি পায়, ক্ষমতা ও পদের জন্য তাদের নাম সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এ ধরনের বুদ্ধিজীবিতা সাধারণত কঠিন প্রশ্ন তোলে না, সমস্যার সমাধানও খোঁজে না, বরং বর্তমানকে এন্টারটেইন করে এবং ভবিষ্যতের কথা কম ভাবে। হান্না আরেন্ট বলেছেন, অপিনিয়ন বা মতামত এগিয়ে যায়, জাজমেন্ট অর্থাৎ মননশীল বিচার পিছু হটে।

একটি উদাহরণ দিই। বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল, যাকে আমি সম্মান করি, ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময়ে আইন-শৃঙ্খলার কথা বলে নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, শাপলা চত্বরের অভিযানকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন ও যারা নির্বাচন বয়কট করেছিল তাদের রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। একই ব্যক্তি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে আবার জোরাল সমালোচনামূলক অবস্থান নেন ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। এখানে আমি বলছি না যে তিনি হিপোক্রেসি করেছেন, বরং তিনি ফিল্ড ডিপেনডেন্স অর্থাৎ সময়ের শক্তিশালী মতামত ও ক্ষমতার প্রবাহের ওপর নির্ভর করেছেন। ২০১৪ সালে আওয়ামীপন্থী ক্ষমতাসীন ন্যারেটিভ জোরালো ছিল এবং বিরোধীদের কৌশল জনপ্রিয় হয়নি। ২০২৪ সালে অ্যান্টি-আওয়ামী বা আওয়ামীবিরোধী ঢেউ শক্তিশালী হয়। এ ঢেউকে অবলম্বন করে অনেক বুদ্ধিজীবী পক্ষ বদলেছেন। চার্লস টিলি ও সিডনি ট্যারোর ভাষায় বলা যায়, তারা পলিটিক্যাল অপর্চুনিটি স্ট্রাকচারস বা রাজনীতির সুযোগসন্ধানী কাঠামোয় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন আর সুযোগ বদলালে নিরাপদ কৌশল হিসেবে ঢেউয়ের সঙ্গে সার্ফ করেছেন। কিন্তু সার্ফিং অর্থাৎ ঢেউ ভাসা আর স্টিয়ারিং অর্থাৎ দিকনির্দেশ একই বিষয় নয়।

কেন বিষয়টি গুরুতর। কারণ এ বুদ্ধিজীবিতা বর্তমানে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের বিরোধিতা করছেন খুব জোরেশোরে। ২০২৬ সালের নির্বাচন আমাদের জন্য সত্যিকারের ট্রানজিশন হতে হবে, কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে ইন্টেরিম সরকার হয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের দিকে যেতে হবে। এর জন্য ক্রেডিবিলিটি অর্থাৎ বিশ্বাসযোগ্যতা, পার্টিসিপেশন অর্থাৎ অংশগ্রহণ এবং ইনক্লুশন অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তি—এ তিনটি শর্ত জরুরি। এখনকার আবহে প্রতিযোগিতা যেন দুই-একটি শক্তির ভেতর আটকে যাচ্ছে, অন্যরা বিশেষ করে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়ার সুযোগ নাও পেতে পারে, জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অস্পষ্ট। আজ যারা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলছে তাদের অনেক সময় প্রো-ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিবাদপন্থী বলে ট্যাগ করা হচ্ছে, ভিন্নমত সহজেই সাইডলাইনে যাচ্ছে। আলেক্সি দ্য তকভিলের ভাষায়, এখানে টাইরানি অব দ্য মেজরিটি বা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি আছে। জন স্টুয়ার্ট মিল মনে করিয়ে দেন যে এ ধরনের প্রেক্ষাপটে অজনপ্রিয় মতও আমাদের অন্ধ স্পট (ব্লাইন্ড স্পট) দেখাতে পারে এবং ভবিষ্যতের সংকট এড়ানোর পথনির্দেশ দিতে পারে।

বাস্তবতা হলো নির্বাচনে রাজনৈতিক মতামতের বড় অংশ বাদ পড়লে তাদের রাজনৈতিক কণ্ঠ হারায় না, বরং রূপ বদলায়। কোনো দলের বা মতের প্রাতিষ্ঠানিক পথ বন্ধ হলে সংঘর্ষমুখী রাজনীতি বাড়ে। এক্সক্লুশন অর্থাৎ বহিষ্কার থেকে আনরেস্ট অর্থাৎ অস্থিরতা, তারপর রিপ্রেশন অর্থাৎ দমন, এরপর ইন্টারন্যাশনাল প্রেসার এবং শেষে নির্বাচিত সরকারের লেজিটিমেসি ইরোশন অর্থাৎ বৈধতার ক্ষয় হয়। এ অবস্থায় রাষ্ট্র সিকিউরিটি-ফার্স্ট অর্থাৎ নিরাপত্তা-অগ্রাধিকার মুডে আটকে যায়, শাসন বা গভর্নেন্সের দক্ষতা পিছিয়ে পড়ে। রাস্তা তখন রাজনৈতিক চাপের কেন্দ্রে চলে আসে, অধিকার-সংক্রান্ত বিতর্ক বাড়ে। সরকার বলপ্রয়োগে শৃঙ্খলা আনতে চাইলে তা অজনপ্রিয় হয় এবং সরকারের লেজিটিমেসি দ্রুত ক্ষয়ে যায়।

এ অবস্থায় অরেটরি বুদ্ধিজীবী চক্র আবার ঘুরে দাঁড়ায়। অস্থিরতা বাড়লেই অনেকে শৃঙ্খলা এখনই চাই—ধরনের অবস্থান নিয়ে কথা বলেন, কেননা তখন সেই টোন জনপ্রিয় হয়। তখন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে এখন স্ট্যাবিলিটি চাই, বাকিটা পরে। যে বুদ্ধিজীবী কণ্ঠস্বর আজ যেমন খারাপ নির্বাচন মেনে নিতে বলছেন, কাল তিনিই এমার্জেন্সি মেজারসের পক্ষে যুক্তি সাজাতে পারেন। জুলিয়েন বেংদা একে বলেছেন ট্রিজন অব দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসঘাতকতা, এখানে বুদ্ধিজীবীরা সর্বজনীন নৈতিক দায়িত্ব ছেড়ে পক্ষ-বিপক্ষের আনুগত্যে দেশ ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থকে অস্বীকার করেন। চমস্কি সহজ করে বলেন, বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হলো সত্য বলা এবং মিথ্যা উন্মোচন করা, বিশেষ করে অস্বস্তিকর সময়ে।

আমি ওরালিটির বিরুদ্ধে নই। আমি চাই পারহেসিয়া অর্থাৎ ঝুঁকি জেনেও প্রকাশ্য সত্য বলা, মানে সাহসী সত্য বলার চর্চা। এর জন্য নিয়ম দরকার। জুর্গেন হ্যাবারমাসের পাবলিক স্ফিয়ার একটি রূপরেখা দেয়, কারণ দেখানো, যাচাই হতে দেয়া এবং তর্কের নিয়ম মানা জরুরি। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায় এথিকস অব রেসপনসিবিলিটি অর্থাৎ ফলাফলের নৈতিকতা দিয়ে এথিকস অব কনভিকশন অর্থাৎ বিশ্বাসের নৈতিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, শুধু নীতির পবিত্রতা নয় বরং নীতির ফলের দায়ও নিতে হবে। বাস্তবে এর মানে হলো আমরা এমন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চাই, যা আগে থেকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিধিনির্ভর রাজনীতির কথা বলে, এমনকি যখন তা ফ্যাশনেবল নয়, প্রমাণ বদলালে ভুল স্বীকার করে, আর হাততালির বদলে লংটার্ম কালেকটিভ কনসিকোয়েন্সেস দেখে কথা বলে।

বাংলাদেশের দরকার এমন পাবলিক থিংকার যারা করতালির লোভ সামলায়, আবার হতাশাতেও ডুবে না। যারা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া রক্ষা করতে নিজের পক্ষের ক্ষতিও মেনে নেয়। যারা একাডেমিক পিয়ার-রিভিউড স্লো নলেজকে পাবলিক স্পেসে আনার সেতুবন্ধ গড়ে। যারা পপুলার ফ্রেমকে জিজ্ঞেস করে কী বাদ পড়ল, কাদের কণ্ঠ নেই, ভবিষ্যতের কোন ঝুঁকি অদৃশ্য হলো। না হলে আমরা আজ যে উচ্চ গলার কণ্ঠে মুগ্ধ হচ্ছি, কাল সেই কণ্ঠের জোরেই নিজের ঘর পুড়িয়ে ফেলব, আজ নয় কাল।

বাগ্মিতাপ্রধান সংস্কৃতির প্রতিষেধক চুপ থাকা নয়, সমাধান হলো নীতিনিষ্ঠ বক্তব্য। যেখানে যুক্তি-প্রমাণ, প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি ফেয়ার প্লে অর্থাৎ ন্যায্যতা এবং অজনপ্রিয় হলেও সত্য বলার সাহস নিয়মিত চর্চা হয়। ভবিষ্যৎ বাঁচাতে আজকের হাততালি একটু কম হলেও ক্ষতি নেই।

আসিফ বিন আলী: ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র