দেশের অলিতে-গলিতে ওত পেতে আছে মানবসৃষ্ট নানা দুর্যোগ। এর মধ্যে অন্যতম অগ্নিকাণ্ড। সামান্য অসাবধানতায় চোখের পলকে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে সব। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালে সারা দেশে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। প্রতিদিন গড়ে এ ঘটনা ঘটেছে ৭৭টি এবং এর ফলে কেবল গত বছরই ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ১৪ টাকা মূল্যের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। বৈদ্যুতিক গোলযোগ, বিড়ি-সিগারেটের টুকরো, চুলা ও গ্যাসের লাইন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে অধিকাংশ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। তবে সারা দেশের তুলনায় রাজধানীতে আগুনের ঘটনা ঘটছে বেশি। প্রতি বছরই ঢাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেখা যায়। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, ইউনাইটেড হাসপাতাল, চকবাজারে রেস্তোরাঁয়, বঙ্গবাজার, নিউমার্কেটসহ নানা জায়গায় ভয়াল অগ্নিকাণ্ডে ঘটেছে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।
ঢাকায় এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে এর পেছনে মূলত দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বেশির ভাগ ভবন নির্মাণ নীতিমালা (বিল্ডিং কোড) মেনে গড়ে ওঠেনি। ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা-২০০৮-এ ইমারতে অগ্নি প্রতিরোধক দরজা, উপকরণ এবং অগ্নি নিরাপদ সিঁড়ি থাকার কথা রয়েছে। কিন্তু বিধিমালা লঙ্ঘন করেই যত্রতত্র গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, রেস্তোরাঁ, ঘিঞ্জি বসতি ও বাজার ব্যবস্থা। ২০০৩ সালে অগ্নিকাণ্ড রোধ ও নির্বাপণ আইন অনুযায়ী, কোনো ভবনে আগুন থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না পেলে সেই ভবনকে অনুপযোগী ঘোষণার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসকে। এছাড়া ২০০৬ সালে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিতে ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় আনা হয়। কিন্তু এসব আইন-কানুন ও নীতিমালার বাস্তবিক প্রয়োগ নেই। কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
এদিকে ফায়ার সার্ভিস কোনো ভবনকে অনুপযোগী ঘোষণা ও সতর্কবার্তা পাঠালেও সেসব ভবনে অবৈধভাবে কার্যক্রম চলতে থাকে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। ফলে এ নির্মমতায় হারাতে হচ্ছে পরিবার কিংবা স্বজনকে।
সহজে ও স্বল্প সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এ অঘটনগুলো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আগুন নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও প্রাথমিক উপকরণ পানি। অধিকাংশ সময় পানিস্বল্পতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে রাজধানী ঢাকায় পানির প্রাকৃতিক উৎস নেই বললেই চলে। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এ শহরে মানুষের চাপে কমে এসেছে জলাশয়। জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ হয়েছে বসতি ও স্থাপনা।
নির্মিত ভবনগুলো দীর্ঘদেহী কিন্তু প্রস্থে বেশ সংকীর্ণ। এক ভবনের সঙ্গে অন্য ভবনের খুব বেশি দূরত্ব নেই, নেই আশপাশে কোনো জলাশয়। একদিকে জলাশয় নেই, অন্যদিকে ঘনবসতিপূর্ণ ভবনের দরুন রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নিয়ে যেতেও বেগ পেতে হয়। উপরন্তু শহরের কোথাও ফায়ার হাইড্রেন্ট (বিশেষ পানির কল) স্থাপন করা হয়নি। প্রাকৃতিক জলাশয় না থাকলেও ফায়ার হাইড্রেন্টের মাধ্যমে আগুন নেভানো সম্ভব। যেহেতু এটি ওয়াটার রিজার্ভার বা মূল পানির লাইনে সংযুক্ত থাকে। এটির সঙ্গে পাইপ সংযুক্ত করে সহজেই পানি পেতে পারেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। অবশ্য বাস্তবে ভবনগুলোয় নেই ওয়াটার রিজার্ভার। অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ওয়াটার রিজার্ভারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে পানি ছাড়া অন্য যেসব নিরাপত্তাসামগ্রী দরকার এবং নির্মাণ কাঠামো যে ধরনের হওয়া প্রয়োজন সেসবের উপস্থিতি নেই অধিকাংশ ভবনে। এছাড়া অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলায় তাৎক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া যায় না।
একবার আগুন ধরে গেলে শুরুতেই নেভানোর যেমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে, ভবনগুলো থেকে নিরাপদে বের হওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থাও পরিলক্ষিত হয় না। লিফট ও মূল সিঁড়ি ছাড়া জরুরি বহির্গমনের বিকল্প সিঁড়ি নেই। আবার ভবনের ভেতরে নেই বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা। ফলে আগুনে দগ্ধ না হয়েও অগ্নিকাণ্ডের সময় ধোঁয়ার কারণে বের হতে না পেরে এবং তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে হতাহত হন অনেকে।
এ দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায় উদ্ধারকাজ বিলম্বের জন্যেও। ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ঢাকা শহরে প্রতি ৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭০ অধিবাসীর জন্য মাত্র একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন আছে। অর্থাৎ ফায়ার সার্ভিসের সংখ্যা যেমন কম, তাদের জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিরও অপ্রতুলতা রয়েছে। অনেক কর্মীও উদ্ধারকাজের সময় মারা যান নিরাপত্তার কারণে। পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে প্রেরণ ও যথাযথ চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় স্বাস্থ্য খাতকে। তাছাড়া বাংলাদেশের শহরগুলোয় অগ্নিকাণ্ডে আহতদের চিকিৎসা দেয়ার মতো ঢাকার তুলনায় লোকবল ও সুযোগ-সুবিধাও অপ্রতুল। পুরো দেশজুড়েই অপরিকল্পত নগরায়ণের চিত্রটি সামনে আসে অগ্নিদুর্ঘটনার সময়ে। এছাড়া নীতিমালা লঙ্ঘন, জবাবদিহির শিথিলতা, অসাবধানতা এসব নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে, যা কমবেশি সবাইকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
অগ্নিকাণ্ড মোকাবেলায় পরিকল্পিত নগরায়ণ অতি আবশ্যক। পরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে উঠলে জলাশয় সংরক্ষণ সম্ভবপর হবে, জনগণের সচেতনতাও বাড়ানো সম্ভব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে পারে অগ্নিকাণ্ড সচেতনতা বৃদ্ধি ও অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণের অন্যতম জায়গা। আগুনের ঝুঁকি এড়াতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার সবার শেখা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পিত নগরায়ণে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার প্রয়োগ নিশ্চিতের বিকল্প নেই। এ বিধিমালা না মানা হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বিধিমালাটির কঠোরভাবে প্রয়োগে নজরদারি বাড়াবে বলে প্রত্যাশা।










