দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এদের ওয়েবসাইট ও ট্রেডিং সিস্টেমে বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিসংখ্যান বিভ্রাট ঘটে থাকে। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় বিনিয়োগকারীদের। বাজারবিমুখ হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীরা যদি তথ্যগত নিশ্চয়তা না পান তাহলে তারা দ্বিধান্বিত থাকেন। পরিসংখ্যান বিভ্রাট বাজারে নেতিবাচক বার্তা দেয়, যা পুঁজিবাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা তৈরি করে। ফলে তারা বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকেন। একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পুঁজিবাজার সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। অথচ প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইকে কারিগরি ত্রুটিমুক্ত করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণে দিনভর সূচকে বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক পরিসংখ্যান দেখা গেছে। এতে হ্রাস পেয়েছে বিনিয়োগের মাত্রা। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো তথ্য না পাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারীই বাজারবিমুখ ছিলেন। এ কারণে গতকাল পুঁজিবাজারে মাত্র ৪৭৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়।’

২০২০ সালের ২০ আগস্ট একবার ওয়েবসাইটের উন্নত সংস্করণ চালু করেছিল ডিএসই। ওই সময় বলা হয়েছিল আপডেটেড ওয়েবসাইটটি বিনিয়োগকারীবান্ধব ও অত্যন্ত রেসপন্সিভ হবে। কিন্তু আপডেটেড ওয়েবসাইট চালুর পর থেকেই ওয়েবসাইটে প্রবেশে সমস্যা, ঠিকমতো তথ্য হালনাগাদ না হওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। বিনিয়োগকারীরা নানা অভিযোগ করেন। এ ঘটনার ঠিক পরপরই ডিএসইর ওয়েবসাইট ও ট্রেডিং সিস্টেমের ত্রুটি অনুসন্ধানের জন্য বিএসইসি ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনে ডিএসইর ওয়েবসাইট ও ট্রেডিং সিস্টেমের যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়েছিল সেগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, ডিএসইর ওয়েবসাইটটি বেশ পুরনো, যা বর্তমান সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাছাড়া পুঁজিবাজারে লেনদেন সম্পন্নের জন্য যে ওএমএস সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় সেটিও ত্রুটিপূর্ণ। বাড়তি লেনদেনের চাপ নেয়ার সক্ষমতা নেই সিস্টেমটির। সিস্টেমটি চালু হয়েছে ছয় বছর হতে চলেছে। অথচ এ ধরনের সফটওয়্যারের মেয়াদ সাধারণত ৮-১০ বছর হয়ে থাকে। এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আগামী দুই-চার বছরের মধ্যে ডিএসইর ওএমএস সিস্টেম হালনাগাদ কিংবা নতুন সফটওয়্যার আনার সুপারিশ করেছিল ওই কমিটি।

কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসইর পক্ষ থেকে ডিএসইর পর্ষদকে দ্রুততার সঙ্গে নতুন ওএমএস সফটওয়্যার আনতে বলা হয়। পাশাপাশি ব্রোকারেজ পর্যায়ে ওএমএস সিস্টেম উন্মুক্ত করতে এক্সচেঞ্জটিকে নির্দেশনা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে যেসব ব্রোকারেজের নিজস্ব ওএমএস রয়েছে সেগুলোকে অনুমোদন দেয়ার জন্য ডিএসইকে বলা হয়। আর যাদের ওএমএস সিস্টেম নেই তাদের সেটি সরবরাহ করার নির্দেশনা দেয় ডিএসই। কিন্তু সম্প্রতি এ পরিসংখ্যান বিভ্রাটের ঘটনা জানান দিচ্ছে ওই কমিটির কোনো সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি, সক্ষমতা বাড়াতে তেমন কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। ফলে ডিএসই কারিগরি ত্রুটির বেড়াজাল থেকে বের হতে পারেনি। তথ্যপ্রযুক্তিগত সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকার কারণে কভিডের সময়ে ৬৬ দিন দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ ছিল। অথচ উন্নত দেশগুলোয় পুঁজিবাজারের লেনদেন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। দেশের পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিএসইর অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। 

ডিএসইর তথ্যপ্রযুক্তিগত অবকাঠামো অত্যাধুনিক করতে হবে। হাই ফ্রিকোয়েন্সির ট্রেডিংয়ের দিকে এগোনো প্রয়োজন এখন। এজন্য হাই ফ্রিকোয়েন্সির প্রযুক্তিরও দরকার হবে। অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস), ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, সিডিবিএলের প্রযুক্তিগত উন্নয়নকাজ শুরু করা জরুরি। সমন্বিত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধন করা গেলে পুরো কার্যপ্রণালি অটোমেটেড করা সম্ভব। চলমান সময়ে কর্মকর্তারা ম্যানুয়ালি তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে আপলোড করার ফলে যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তা দূর করা যাবে যদি সব কাজ অটোমেডেট হয়। স্টক এক্সচেঞ্জের প্লাটফর্মে কোম্পানিগুলোই যথাযথ ও সঠিক তথ্য সময়মতো প্রকাশ করতে পারবে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা যাবে। ফলে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন। তাদের স্বল্প সময়ে বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করা গেলে পুঁজিবাজার চাঙ্গা থাকবে। এছাড়া এর ফলে পুঁজিবাজার আরো বড় ও স্বচ্ছ হবে এবং বাজারে লেনদেন বাড়বে। প্রকৃত তথ্য সময়মতো প্রকাশ করা গেলে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

পুঁজিবাজারের বড় স্টেকহোল্ডার হলেন বিনিয়োগকারীরা। সঠিক তথ্য না পেলে তারা ভোগান্তিতে পড়েন। তাদের ভোগান্তি পুঁজিবাজারের উন্নতির অন্তরায়। তথ্যগত বিভ্রাট দূর করতে হলে অবকাঠামোগত পরিবর্তন যেমন আবশ্যক, তেমনি দক্ষ জনশক্তিরও প্রয়োজন রয়েছে। তাই ডিএসইর অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে দক্ষ জনবলের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি কমবে এবং আস্থা বাড়বে। 

পাশাপাশি, ডিএসইর তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিলে তা খতিয়ে দেখা উচিত। কারিগরি ত্রুটির বাইরে যদি ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল কেউ করে থাকে তাকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ডিএসইর ও বিএসইসিকে কঠোর হতে হবে এবং কড়া নজরদারির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। 

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিদ্যমান এক্সচেঞ্জগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে ইতিবাচক প্রণোদনার প্রয়োজন আছে। দেখা যায় যে কোনো তুচ্ছ সমস্যা সমাধানের জন্য বিদেশী ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হওয়া এক ধরনের প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের পুঁজিবাজারের। বিদেশীদের ওপর এ নির্ভরতা পরিহার করা জরুরি। এজন্য এক্সচেঞ্জগুলোর সেই সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সক্ষমতা বাড়লে আশা করা যায় বিনিয়োগকারীদের অন্তত তথ্যপ্রাপ্তিতে কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হবে না।