কোনো দেশে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে স্টিল বা ইস্পাত শিল্প। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কোনো দেশের পরিবহন, জ্বালানি, ভারী প্রকৌশল ও নির্মাণ খাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ স্টিল। দেশের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কয়েক বছরে স্টিল শিল্পের ১৫-২০ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে। বর্তমানে স্টিল শিল্পের বাজারের আকার ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ খাতে পুরনো শিল্প জায়ান্টের পাশাপাশি নতুন কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। সম্ভাবনাময় এ শিল্প খাতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে শুল্কমুক্ত তৈরি পণ্য আমদানি। 

গতকাল প্রকাশিত বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, শুল্কমুক্ত তৈরি পণ্য আমদানি বন্ধসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে স্টিল বিল্ডিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এসবিএমএ)। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সঙ্গে বৈঠক করে সংগঠনটির নেতারা তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনামন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে সংগঠনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অন্য দাবিগুলো হলো ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন-বহির্ভূত স্টিল বিল্ডিং ম্যানুফ্যাকচারারদের ভ্যাটের আওতায় আনা ও সরকারি বৃহৎ প্রকল্পের টেন্ডারে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মানসম্পন্ন সব প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার ম্যানুফ্যাকচারারদের স্টিল বিল্ডিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এসবিএমএ) সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড শিল্পকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। 

বাংলাদেশ স্টিল মিলস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বরাতে জানা যায়, দেশে প্রায় চার শতাধিক স্টিল মিল রয়েছে, যাদের উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ লাখ টন। দেশে ৭০ লাখ টন ইস্পাতের চাহিদা পূরণের পর রফতানির সুযোগ রয়েছে। এ খাতে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। 

২০২২ সালের ২৯ মে প্রকাশিত বণিক বার্তার অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে মেগা প্রজেক্টসহ অনেক নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এসব প্রকল্প দেশের ইস্পাত খাতের চাহিদা বাড়িয়েছে। বাড়তি এ চাহিদা পূরণের জন্য ইস্পাত খাতের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ ও সক্ষমতা দুটোই বাড়িয়েছে। এমন মুহূর্তেই ব্যয় সংকোচনের নীতি থেকে নিতান্ত জরুরি ছাড়া নতুন করে অন্য কোনো প্রকল্প হাতে না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিষয়টি দেশের ইস্পাত খাতে উদ্বেগের সঞ্চার করেছে। চাহিদা হ্রাসে বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বোঝা হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) ও উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দেশে ইস্পাত খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১১ সালে দেশে সম্মিলিতভাবে এমএস রড উৎপাদন হতো ২৫ লাখ টন। ২০১৬ সালে এটি ৫৫ লাখ টনে দাঁড়ায়। বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী বছরে গড়ে উৎপাদন হচ্ছে ৬৫ লাখ টন। উৎপাদিত রডের তুলনায় বাজারে সরবরাহ করা রডের পরিমাণ কিছুটা কম। ২০১৬ সালে বাজারে গড়ে ৫০ লাখ টন রড বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে এর পরিমাণ ৬০ লাখ টনের বেশি। যদিও ইস্পাত উৎপাদকদের রড উৎপাদন সক্ষমতা আরো বেশি। ২০১৬ সালে ইস্পাত খাতের মোট সক্ষমতা ছিল ৭০ লাখ টন, যা বর্তমানে ৮০ লাখ টন ছাড়িয়েছে। 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সরবরাহ চেইন সংকট, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভোক্তা চাহিদা কমেছে। অন্যান্য খাতের মতো ইস্পাত শিল্পেও তার প্রভাব পড়েছে। ব্রাসেলসভিত্তিক ওয়ার্ল্ড স্টিল অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে বাংলাদেশে অপরিশোধিত ইস্পাত উৎপাদন হয়েছে ৫২ লাখ টন, যা তিন বছরের সর্বনিম্ন। কভিড-১৯ মহামারী সত্ত্বেও ২০২০ ও ২০২১ সালে বাংলাদেশের বার্ষিক ইস্পাত উৎপাদন ছিল ৫৫ লাখ টন। বৈশ্বিকভাবে ওই দুই বছরে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যথাক্রমে ২৮ ও ২৯তম। ২০১৯ সালে ৫১ লাখ টন উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩০তম। দেশের অর্থনীতিতে শ্লথগতির কারণে ইস্পাতের চাহিদা কমছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। 

গত বছর শুরু হওয়া ডলার সংকটের কারণে অবকাঠামো ও নির্মাণ খাত মারাত্মকভাবে ধুঁকছে। তবে জনবসতিপূর্ণ দেশটিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে অবকাঠামো ও নির্মাণ শিল্পের চাহিদা চাঙ্গা থাকায় এ খাতের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের ফলে বিদেশী পণ্যের সঙ্গে টেক্কা দেয়া ও অ্যান্টি ডাম্পিংয়ের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সম্ভাবনাময় দেশীয় ইস্পাত শিল্পকে। 

এমন পরিস্থিতিতে শুল্কমুক্ত তৈরি পণ্য বন্ধসহ পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে এসবিএমএর নেতারা যে দাবি উত্থাপন করেছেন তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। স্থানীয় ইস্পাত শিল্প শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে হলে দেশের ক্রমবর্ধমান নির্মাণ খাতে টেন্ডার প্রদানে বিদেশী কোম্পানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে সুযোগ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করতে পারলে এবং দুর্নীতি প্রশমন করতে পারলে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান বিশ্বমানের কাজ উপহার দিতে পারবে। 

গত কয়েক বছরে ইস্পাত খাতসংশ্লিষ্টরা যে বিনিয়োগ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা পুরোপুরি ফল দেয়া শুরু করলে আমরা দেশীয় চাহিদা পূরণ করে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারব। বিশ্বের সর্বোচ্চ ইস্পাত উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ চীন থেকে অনেক কোম্পানি কারখানা স্থানান্তর করছে। ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে এ সুযোগ বাগিয়ে নেয়ার লড়াইয়ে নামতে হবে আমাদের। এরই মধ্যে চীন থেকে ছয়টি কোম্পানি বাংলাদেশে ইস্পাত খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এসব বিনিয়োগ এলে রফতানি অনেক বাড়বে। বর্তমানে ভারতের সেভেন সিস্টারে রড, অ্যাঙ্গেল ও বার রফতানি হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো নতুন বাজারে রফতানি ব্যাপৃত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দেশের ইস্পাত শিল্প সুরক্ষা ও শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।