স্বাধীনতার পর দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে গড়ে তোলাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে অগ্রসর হয়েছি। ওষুধ শিল্পে ও স্বাস্থ্য শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রসার ঘটেছে।

তবে সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। দক্ষ চিকিৎসক ও জনবল সংকটও প্রকট। চিকিৎসা নিতে মানুষকে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে যেতে হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশীদের পছন্দের শীর্ষে ভারত।  চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় স্থান মনে করছেন ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের রোগ নির্ণয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে ভালো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, রোগ নির্ণয়ের আধুনিক সরঞ্জাম, ফার্মেসি—সবকিছুই রয়েছে। তবে সেখানে চিকিৎসাসেবা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ব্যাঙের ছাতার মতো জেলা-উপজেলা পর্যায়ে লাইন্সেসবিহীন বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এসব সেন্টারে রোগীরা নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছে। ভুল চিকিৎসায় সুস্থ রোগীও মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। বাংলাদেশ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, কভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচি, কালাজ্বর নির্মূলসহ বিভিন্ন ভার্টিক্যাল স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। তবে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তা সূচক ও স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সূচকে আমরা অনেক পিছিয়ে। ২০০০ সালে প্রথম স্বাস্থ্যনীতি এবং ২০১১ সালে দ্বিতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করা হয়। তবে তা এখনো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অন্যদিকে ২০১২ সালে প্রণীত হেলথকেয়ার ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়নে তেমন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের আওতায় আনতে দরকার টেকসই সংস্কার।  করোনা-পরবর্তী খাতভিত্তিক কর্মসূচিতেও পরিবর্তনের তেমন কোনো রূপরেখা দৃশ্যমান হয়নি। আমাদের নীতিনির্ধারণী মহলকে স্বাস্থ্য খাত এবং এ খাতের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জোর দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতকে অন্যান্য খাত থেকে আলাদা হিসেবে ভাবতে হবে। 

দেশের কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয় আশির দশকে। চার দশকেও সরকারি পর্যায়ে এর চিকিৎসাসেবায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। দেশে এ রোগের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ ও একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (এনআইকেডিইউ)। এ প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৫০টির মতো কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। তবে সরকারি অন্যান্য হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোয় এ সংখ্যা আরো নগণ্য।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, সর্বসাধারণের জন্য কিডনি রোগের চিকিৎসা দেয়ার লক্ষ্যে ২০০১ সালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র হিসেবে এনআইকেডিইউ প্রতিষ্ঠা করে সরকার। ১০০ শয্যায় রোগী ভর্তির কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৩ সালে। পরে ২০১২ সালে হাসপাতালটিকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। গত বছরের জুলাইয়ে তা আরো বাড়িয়ে ৩০০ শয্যা চালু হয়। এর কিছুদিন পর ৫০০ শয্যার প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়া হয়। যদিও বর্তমানে ৩০০ শয্যায় রোগী ভর্তির সুবিধা রয়েছে। 

প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন হয় ২০০৫ সালের এপ্রিলে। এরপর দুই বছর বিরতি দিয়ে ২০০৮ সালে চারটি, ২০০৯ সালে আটটি, ২০১০ সালে চারটি, ২০১১ সালে পাঁচটি, ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিনটি করে, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে একটি করে কিডনি প্রতিস্থাপন হয়। এরপর পাঁচ বছর সে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। ২০২১ সালে তা আবার শুরু হলে ওই বছর কিডনি প্রতিস্থাপন হয় মোট তিনজন রোগীর। এছাড়া ২০২২ সালে পাঁচটি, ২০২৩ সালে ১১টি এবং সর্বশেষ গত ২০ জানুয়ারি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে একজনের কিডনি। সে হিসেবে শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৫০ রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন করেছে সরকারের বিশেষায়িত এ সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। 

হাসপাতালটির পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির জনবল সংকট তীব্র। ১৫০ শয্যার হাসপাতাল অনুসারে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য জনবলের জন্য ৬৬০টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। নতুন করে শয্যা বাড়লেও পদের অনুমোদন হয়নি। আগের পদের মধ্যেও শতাধিক শূন্য। ১৩২টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে রয়েছেন ১০৬ জন। তবে ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রায় ২ হাজার ৭০০ জনবল প্রয়োজন।

দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও এনআইকেডিইউ ছাড়াও আরো আটটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপন হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিস্থাপন করেছে সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির এ সংখ্যা দেড় সহস্রাধিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করেছে ৬২৫টি। এছাড়া বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতাল, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিডনি প্রতিস্থাপন করছে। যদিও পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে পপুলারে সেবাটি বন্ধ রয়েছে। 

কিডনি প্রতিস্থাপনে এগিয়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও প্রতিবেশী ভারত। সেসব দেশের মডেল আমরা অনুসরণ করতে পারি। কিডনি প্রতিস্থাপন একটি ব্যয়বহুল চিকিৎসা। প্রতিনিয়ত দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এদিকে কিডনি রোগীর প্রায় ৯০ শতাংশই চিকিৎসা ও ডায়ালিসিস খরচ মেটাতে না পারায় মৃত্যু বাড়ছে। তাই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কিডনি রোগের চিকিৎসা সাধারণ মানুষের পক্ষে করা অসম্ভব।  সবার জন্য কিডনি রোগের চিকিৎসাকে সহজ করতে সরকারি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটসহ অন্য  প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর উদ্যোগ ও সরকারি ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন। জনবল সংকট কাটাতে পদক্ষেপের পাশাপাশি কিডনি রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সার্জনের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। 

সরকারি হাসপাতালগুলোয় সেবার মানোন্নয়নে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা দরকার। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও একটি যথাযথ অর্গানোগ্রাম, স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা কমিটি, এথিক্যাল কমিটি, অডিট কমিটি, সাপ্লাই চেইন, সমন্বিত আইটি সিস্টেম চালু এবং স্বাস্থ্য খাতের উন্নতিতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। হাসপাতাল ও সেবার মান উন্নত করতে হলে আমাদের ভৌতিক অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি; পাশাপাশি সাপোর্ট সার্ভিস ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে স্বার্থহীন, দূরদর্শী ও গতিময় নেতৃত্ব প্রয়োজন।