চলতি বছরের ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে বিধ্বস্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন শ্রেণীকক্ষে, যেখানে ক্লাস চলছিল। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৩৬ শিক্ষার্থী, শিক্ষিকা, কর্মচারীসহ বিমানের পাইলট প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আহত হন প্রায় ১৫০ জন। এর মধ্যে গুরুতর আহতদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। দুর্ঘটনার পর পর সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে এ দুর্ঘটনায় আহত সবার চিকিৎসা সরকার করাবে। একই সঙ্গে সব বেসরকারি হাসপাতালে এ দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। এমনকি যেকোনো ধরনের অপারগতায় রোগীকে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট অথবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শও দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা একেবারে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। অথচ আহতরা আজও শরীরে ক্ষত নিয়ে দিন যাপন করছে। তাদের মানসিক ট্রমাও পুরোপুরি কাটেনি।

বণিক বার্তার সরজমিন প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বিশেষায়িত হাসপাতাল জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৭। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩১ জন। অন্যরা মারা গেছেন। বর্তমানে ভর্তি আছে পাঁচ শিশু। তিন মাসের অধিক সময় ধরে তাদের চিকিৎসা চলছে। অন্যদিকে অনেকে রিলিজ পেলেও নির্দিষ্ট সময় পর পর ফলোআপের জন্য আসতে হচ্ছে। অনেকের ক্ষত শুকালেও নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিতে হচ্ছে। মানসিকভাবেও কমবেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে আহতদের প্রায় সবাই। তাদের দরকার বিশেষজ্ঞ মানসিক চিকিৎসকের অধীন উন্নত কাউন্সেলিং। দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার ব্যয় বহন করতে গিয়ে এরই মধ্যে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেলেও আর্থিক কোনো সহযোগিতা পাননি তারা। কিন্তু আনুষঙ্গিক অনেক খরচও করতে হচ্ছে তাদের। সব মিলিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে গেছে অনেক পরিবার। আবার পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পাওয়াসহ চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও উঠেছে স্বজনদের পক্ষ থেকে। সরকারি-বেসরকারি কোনো পক্ষ থেকেই আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন আহতদের স্বজনরা।

চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি নাকচ করে দিলেও সরকারি সহায়তা না পাওয়ার বিষয়টি জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের একজন সহযোগী অধ্যাপকও স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় আহতের চিকিৎসায় সরকার থেকে ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে। এটা মোটেও কাম্য নয়। কেবল হাসপাতালের চিকিৎসার ব্যয় নয়, আহতদের চিকিৎসার পুরো দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। সরকারকে আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসাসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা সুস্থভাবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। এজন্য আহতের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থাও দ্রুত করতে হবে। কেননা এ দুর্ঘটনার অন্যতম দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের নীতি বাস্তবায়নের ব্যর্থতার নজির ছিল মাইলস্টোন দুর্ঘটনা। এ দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনেও সে চিত্রই উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধবিমানের পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মাইলস্টোন স্কুলের ভবন নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিল্ডিং কোডের অনুমোদন মানা হয়নি, সেটিও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ভবনে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও সেখানে মাঝ বরাবর একটি সিঁড়ি ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনটি সিঁড়ি থাকলে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরো কম হতো। অর্থাৎ বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। বিমান প্রশিক্ষণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ একটি এলাকায় বিল্ডিং কোড না মেনে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার দায় সরকার বা রাজউক কখনই অস্বীকার করতে পারে না। তাই সরকারের উচিত নিহতদের পরিবার ও আহতদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত পরিবার ও আহত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির ভাষ্যমতে, আর্থিক ক্ষতিপূরণের জন্য তারা (কমিটি) সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু কোনো ইতিবাচক ফল পায়নি। অন্যদিকে নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ৫ কোটি ও আহত শিক্ষার্থীদের জন্য ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। রিটের শুনানি এখনো হয়নি। অর্থাৎ আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি একপ্রকার অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়ে গেছে। এ অনিশ্চয়তা অনতিবিলম্বে দূর হওয়া প্রয়োজন। সরকারের এগিয়ে আসা দরকার। অনেক পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আহতের সেবায় সময় দেয়ার কারণে কাজে যেতে পারছেন না। আবার নিহত অনেকের পরিবারের জন্য এ দুর্ঘটনা মানসিক সংকটের কারণ হয়ে উঠেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন হাসপাতালের চার দেয়ালে চিকিৎসাধীন থাকায় মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক শিশু। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অনেকেই এখনো বিমান দেখলে চমকে ওঠে, শব্দ শুনলে ভয় পায়। এতে পড়ালেখা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তায় রয়েছে পরিবারগুলো। অন্যদিকে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নেও অর্থ ও শ্রম দিতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। সরকারকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এসব শিশু ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। এর বাইরে বিমান বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদেরও এগিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন।

আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সুচিকিৎসা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা সেটিও তদারকি করা দরকার। আহতের পরিবার থেকে চিকিৎসায় অবহেলার যে অভিযোগ উঠেছে সেটিও খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করা হোক। কোনো অবহেলার কারণে একটি শিশু স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না, এমনটা যেন না হয়। এজন্য শারীরিকের পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসাকেও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার আহত ও তাদের পরিবারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও সহযোগিতা নিশ্চিত করবে— এটাই প্রত্যাশা।