অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রফতানি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রফতানি পণ্যের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। সে রফতানির বিপরীতে আয় প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ দুই প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের মধ্যে বিস্তর তফাত। কারো তথ্যের সঙ্গেই কারো তথ্যের মিল নেই। রফতানির তথ্য নিয়ে এ ধরনের ফারাক কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরনের বিভ্রান্তি জাতীয় অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ, নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে সার্বিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। এ অবস্থায় সরকারের গোটা বাণিজ্য পরিসংখ্যান নিয়েই বড় ধরনের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। রফতানির তথ্য নিয়ে এ ধরনের বিভ্রান্তি নিরসন করে অনতিবিলম্বে সমন্বিতভাবে সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশে উদ্যোগ নিতে হবে।
ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যানে নীতি প্রণয়নেও সমস্যা হয়। ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে শুল্ক আরোপ করা হলে তার কার্যকারিতা থাকে না। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা দেয়, সেখানেও জটিলতা সৃষ্টি হয়। ব্যাংকের নজরদারি আরো জোরদার ও তথ্য সমন্বয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সব তথ্য ও পরিসংখ্যান সমন্বয় হওয়া উচিত।
রফতানি ও প্রকৃত রফতানি আয়ের পার্থক্যের সমস্যা ভারত ও পাকিস্তানেও বিদ্যমান। এক্ষেত্রে উভয় দেশই তিন মাস পর রফতানি আয়ের তথ্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ এপ্রিলের রফতানি আয়ের তথ্য জুলাইয়ে প্রকাশ হয়। এতে আয়ের সমন্বয় ঘটে এবং ওই মাসের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায়। শুধু তা-ই নয়, ভারতে রফতানির তথ্য সমন্বয়ে স্বতন্ত্র বোর্ড রয়েছে যেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ হিসাব করে কোন মাসে কত রফতানি আয় আসে সেটি। এটি এপ্রিল না মে মাসের রফতানি আয় তা স্পষ্ট হওয়া যায় না।
বিশ্বের প্রতিটি দেশ রফতানি আয়ের একটি তথ্য প্রকাশ করে। আর বাংলাদেশে দুটি উৎস থেকে এটি প্রকাশ করায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দ্রুতই এটি দূর করা প্রয়োজন। রফতানি আয়ের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অন্যদের সমন্বয়পূর্বক প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে ভিন্ন তথ্যের জটিলতা কমে আসবে।
বণিক বার্তার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, এনবিআরের পরিসংখ্যান থেকে ইপিবি সংকলিত তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিশ্ববাজারে ২ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছেন বাংলাদেশের রফতানিকারকরা। ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা অর্থপ্রবাহের পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, পণ্য রফতানি বাবদ জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে অর্থপ্রাপ্তি হয়েছে ১ হাজার ৮৯৬ কোটি ডলার। এ হিসাবে ঘোষিত রফতানি ও অর্থপ্রাপ্তির পার্থক্য প্রায় ৮৫৮ কোটি ডলার বা ৩১ শতাংশের কিছু বেশি।
তবে কোনো রফতানিকারক কর্তৃক অর্থ ফেরত আনতে না পারা বা বিলম্ব হওয়ার যৌক্তিক কারণ উপস্থাপন করতে না পারলে তাদের সব সুবিধা বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে যৌক্তিক ও উপযুক্ত কারণে কেউ অর্থ ফেরত আনতে না পারলে তার সব ধরনের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আলাদা সেল থাকা আবশ্যক। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দক্ষ প্রতিনিধিদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কমিটিকে অবশ্যই কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে রফতানি আয়ের প্রত্যাবাসন তদারকি এবং উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে।
মূলত রফতানির বড় অংকের অর্থ অপ্রত্যাবাসিত থেকে যাওয়ার কারণেই ট্রেড ক্রেডিটের ঘাটতি বাড়ছে, যা প্রকারান্তরে আর্থিক হিসাবের ঘাটতিকেও বাড়িয়ে তুলছে। রফতানি আয় কম আসার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, রফতানির বড় অংকের অর্থ অপ্রত্যাবাসিত থেকে যাওয়া।
সাধারণত আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার হয় বেশি। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রফতানির ক্ষেত্রে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং) অর্থ পাচারের অন্যতম কৌশল। এছাড়া ভুয়া রফতানি লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) এবং ক্রয়চুক্তির মাধ্যমেও অর্থ পাচার হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি ও তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করা প্রয়োজন। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কাজটি যেহেতু অপেক্ষাকৃত জটিল, সেহেতু পাচার রোধের বিষয়টিতে জোর দেয়া উচিত বেশি। অন্যদিকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য বিদেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য রফতানি আয়ের পরিপূর্ণ ও যথাযথ তথ্য নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে রফতানি আয় সমন্বয়ের বিষয় থাকলে দ্রুতই সেটি করা প্রয়োজন। তবে রফতানিকারকদের দাবি, হিসাব সংকলন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে অর্থ পাচারের সন্দেহ ও অভিযোগের শিকার হচ্ছেন তারা। এ ধরনের সন্দেহ ও অভিযোগ দূর করতে সমন্বিতভাবে সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে হবে।
এনবিআর তার অধীন সংস্থার মাধ্যমে রফতানি পণ্যের পরিসংখ্যান আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করে। আর এনবিআর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেশের সামগ্রিক রফতানির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ইপিবি। তাছাড়া রফতানির বিপরীতে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থপ্রাপ্তির হিসাব করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু অর্থবছর শেষে দুই প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে মেলে দুই ধরনের তথ্য। এতে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে, বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। ইপিবি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের দেখা উচিত তারা রফতানির পরিমাণ-সংক্রান্ত কী তথ্য পাচ্ছে। কম বা বেশির বিষয়গুলো শনাক্তের পর কারণগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। রফতানি ও অর্থপ্রাপ্তির পার্থক্য কমিয়ে আনতে এ তিন সংস্থার সমন্বিত প্রয়াস জরুরি।










